Sunday, March 4, 2018

TOILET - Ek Prem Katha (টয়লেট - একটি প্রেমের কথা)



একটি ভারতীয় সিনেমার কথা-->
খোলা আকাশের নিচে, খোলামেলা জায়পায়, ঝোপে, জঈলে, ক্ষেতে, রেল-লাইনে
পেট সাফের কাজ করার তালিকায় বিশ্বের জরিপে ভারতের নাম ১নম্বর তালিকায় থাকার কারন কি সিনেমাটি দেখে ধারনা পেলাম।

কাহিনী সংক্ষেপঃ
সিনেমার শুরুতে নায়ক-নায়িকার বিয়ের পর নায়িকা নায়কের বাড়িতে এসে দেখে তাদের বাড়িতে কোন টয়লেট নাই। বাড়ির সব মানুষ খোলা জায়গায় পেট সাফ করতে যায়।নায়িকা, নায়ক মানে তার স্বামীর কাছে দাবী করে ঘরের ভেতর পায়খানা বানাতে হবে। 
নায়ক তার নিজ বাপের সাথে কথা বলতে যায়, ঘরের ভেতর টয়লেট বানাতে হবে জানায়। নায়কের ইচ্ছায় তার বাপের চরম আপওি। নায়কের বাপ নায়ক কে একটি ডায়লগে বলেন, পেট সাফ করতে হয় খোলা আকাশের নিচে। বেশি লেখা-পড়া করলে যা হয় আরকি। দুই দিনের শিক্ষিত মাইয়া শত বছরের সংসক্রিতি ভাইংগা আইছে ঘরের ভেতর টয়লেট বানাইতে...যা যা আমি মরলে শ্বশানে না নিয়া আমার চিতা ঘরেই জ্বালাইস, তারপর ঘরের ভেতর টয়লেট বানাইস বলে নায়ককে তাড়িয়ে দেন।
চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরেও বাপকে রাজি করাতে পারছে না। একের পর এক আইডিয়া। প্রতিদিন সকালে বাইকে চেপে রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে দাড়িয়ে থাকা ট্রেনের ভেতর পায়খানায় পেট সাফ করতে নায়ক তার বউকে নিয়ে যায়। বেশ কয়েকদিন চলতে থাকে এভাবে। প্রতিদিনের মতো পেট সাফাই করতে গিয়ে একদিন টয়লেট থেকে বেরিয়ে নায়িকা ট্রেনের দরজায় এসে দাড়ায়।
প্লাটফর্মে দাড়িয়ে নায়ক ইশারায় ডাকছে, নামো। নামো।
নায়িকা সেদিন রেগে দাড়িয়েই রইল।
ট্রেন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলে নায়ক তখন উওেজিত গলায় বলতে থাকে, নামো। তারাতারি নামো।
সেদিন নায়িকা আর নামে না। ট্রেনে চড়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। মোবাইল ফোনে নায়কের সাথে কথায় জানায়, ঘরের ভেতর টয়লেট না বানালে সে আর ফিরবে না।
এ খবর পএিকায় পর্যন্ত প্রকাশ করলে নায়ক পএিকা অফিসে সাংবাদিককে পেটাতে গিয়ে ফিরে আসার সময় দেখতে পায় বাজারে সিনেমার শূটিং চলছে। সেখানে তার নজর পরে ভ্রাম্মমান টয়লেটের দিকে। এক বন্ধুর সহযোগিতায় সেখান থেকে একটি টয়লেট চুরি করে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাপ বাইরে গেলে ঘরে ঢুকাবে ঠিক করে আপাতত ঢেকে লুকিয়ে রাখে।
শ্বশুুর বাড়িতে লুকিয়ে রাতে বউয়ের সাথে দেখা করতে গিয়ে ফিরে আসতে অনুরোধ করে। বউকে বলে, গিয়ে যা দেখবা খুশি হবা।
পরের দিন ভ্রম্মমান টয়লেট চুরির দায়ে নায়ককে পুলিশ ধরে নিয়ে লকাপে আটকায়। নায়িকা অভিযোগকারীর সাথে সমঝোতা করে মামলা তুলে নায়ককে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
এরআগে পএিকা অফিসে সাংবাদিককে পেটাতে গিয়ে জানতে চায় চায়, ওই বেটা সাংবাদিক এমন খবর প্রকাশ করে আমার সাথে মজা করলি কেন বল?
সাবাদিক সাফাই দেয়, যা করেছি আপনার লাভ বলেই করেছি।
লাভ। এতে আবার লাভ কিসের?
এবার আপনার বউয়ের বাড়ির মানুষ লজ্জায় আপনার বউকে ফিরে যেতে চাপ দিবে।
কিন্ত এমন হলোনা। নায়িকার বাড়ির লোকেরাও একই দাবিতে নায়িকার সিদ্ধান্তে অটল।
থানা থেকে নায়ককে ছাড়িয়ে নায়িকা এবার আরো বেশি রাগ নিয়ে বাপের বাড়ি যায়। দূরত্ব আরো বাড়ে। বিচ্ছেদের যন্তনায় গান গায়।
এক পর্যায়ে টয়লেটের সিদ্ধান্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়। নায়ক সরকারের নামে মামলা দায়ের করেন। হয়তো শ্বশুর বাড়িতে বউদের ঘরে টয়লেট দিতে হবে, নয়তো আমার বউকে তালাক।


-রফিকুল ইসলাম সাগর
ঢাকা

Thursday, September 8, 2016

পাগলের মেলায়


“ভ্রমণ তো বানিয়ে তোলা গল্পকথা নয়, মানুষের সত্যিকারের জীবনকাহিনি। আর তাই ভ্রমণ কাহিনি মনে শুধু আনন্দই এনে দেয় না, চোখের জল অথবা প্রতিবাদের ভাষাও জাগিয়ে দিতে পারে। ট্যুরিজম ইন্ড্রাস্ট্রির সহায়ক বিজ্ঞাপনী প্রচারমাধ্যম ছাড়াও ভ্রমণ কাহিনির বড় পরিচয় বিশ্ব সাহিত্যের একটি অন্যতম ধারা রূপেও। তেমনই কিছু 'অন্য ভ্রমণ' কথা।”  Read more about :: Amader Chhuti ::


রফিকুল ইসলাম সাগর

কখনও কখনও কোনও রকমের পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই বেরিয়ে পড়ি,শহর ছাড়িয়ে অচিন কোনও গাঁয়ের পথে। এইতো কিছুদিন আগের কথা,ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত এগারটা ছুঁইছুঁই। ঘরে ফিরব ফিরব করছিলাম। তখনই বন্ধু শাকিল জানাল,প্রাইভেট কার নিয়ে ভোরবেলা মতলব যাবে। সঙ্গে যাবে জাহাঙ্গীর ভাই। আমাকেও যাওয়ার জন্য খুব জোর করল। যাব না বললাম প্রথমে। কিন্তু তারপরই মন দেখি যাই যাই করছে। যাব কি যাব না পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। বললাম,বাসায় গিয়ে ঠিক করি,তারপর জানাচ্ছি। ঘরে ফিরেই ঠিক করলাম ঘুরেই আসি। বন্ধুকে যাচ্ছি বলে জানিয়ে দেওয়ায় খুব খুশিও হল। খুব ভোর বেলা মোবাইলটা বেজে উঠল। ডাক পড়ল। বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর পাঁচটা প্রায়। ঘন্টাখানেক পর ভাড়া করা গাড়িতে শাকিল আর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে রওনা দিলাম। রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা। শহরের ঘুম ভাঙার আগেই আমরা পেরিয়ে গেলাম। মহাখালী থেকে রওনা হওয়ার সময়ই জাহাঙ্গীর ভাই নাস্তা খাওয়ার কথা বলেছিল। পরে গাড়িতে বসে কথায় কথায় কাচপুর ব্রিজ চলে এলাম। ড্রাইভারকে জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, সামনে কোনও ভালো রেস্টুরেন্টে থামাতে,খুব খুদা লাগছে। খুদা অবশ্য লাগারই কথা তিনজন ননস্টপ কথা বলেই যাচ্ছিলাম। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের কেড়ে নিয়ে যেন চলছিল কথার প্রতিযোগিতা। অবশেষে সেই সামনেটা হলো মেঘনা ব্রিজ পেরিয়ে। একটি রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকলাম। নান রুটির সাথে ডাল অর্ডার করে অপেক্ষা করছিলাম। ওয়েটার বলল,নান রুটি হবেনা। পরোটা হবে। জাহাঙ্গীর ভাই কিছুটা উত্তেজিত গলায় বললেন,যা আছে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। কয়েক মিনিট পর পরোটার প্লেট আর ডালের বাটি সামনে রেখে গেল ওয়েটার। খাবার দেখতে ছিল আকর্ষণীয়। খেয়েও আমরা সবাই সন্তুষ্ট। সব শেষে চা-পান করে উঠে পড়লাম। দাউদকান্দি ব্রিজ পেরিয়ে ডান দিকে শ্রীরায়ের চর রাস্তায় ঢুকলাম। সামনে বিশাল বড় এক ট্রাক। গোটা রাস্তা দখল করেছে। ট্রাকটিকে ওভারটেক করে সামনে যাওয়ার মতো ফাঁক নেই রাস্তায়। ট্রাক একটু যায়,একটু থামে। পিছন পিছন আমাদের গাড়ি। এভাবে যেতে যেতে ট্রাকটি সামনে গিয়ে ডানদিকের আরেকটি রাস্তায় ঢুকল। আমরা সোজা চললাম। ট্রাকের পিছনে আটকা পরে দু মিনিটের পথ যেতে আমাদের সময় লাগল প্রায় পনের মিনিট। এবার একটাই পথ তবে আঁকাবাঁকা। যে জন্য কম গতিতে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল। প্রায় পাঁচ কি.মি. পথ পেরিয়ে গাড়ির চালক মুখ খুললেন। এক এক করে বলতে শুরু করলেন,এই পথে পূর্বে কবে কবে এসেছিলেন। তার সঙ্গে পথে কিছু কিছু জায়গা দেখিয়ে বলছিলেন, তিনি এখানে এসেছেন,সেখানে এসেছেন। এরপর আমরাও তাকে নানারকম প্রশ্ন করছিলাম। যাচ্ছিলাম লেংটার মেলা নামে খ্যাত হযরত সোলেমান শাহ (র:)-এর মাজারে। গাড়ি চালকের কাছে সোলেমান শাহ (র:) সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বললেন, 'সোলেমান শাহ উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান আউলিয়ার দাবিদার। তিনি পোশাক পরিধান করতেন না আর তাই লেংটা বাবা নামেও পরিচিত। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মতলবের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিয়ে করেছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সারাদেশ ঘুরে বেড়ালেও মতলবের বেলতলীতে বেশিরভাগ সময় থাকতেন। ওরসের সময় এই বেলতলীতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। আশে-পাশের কয়েক গ্রামজুড়ে ভক্তেরা থাকেন। কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে বসে ভান্ডারী, মারফতী ও বাউল গানের আসর। এছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবারও গানের আসর জমে। অনেকে এ আসরকে লেংটার মেলা, পাগলের আসর, পাগলের মেলাও বলে।

লেংটার মেলা সম্পর্কে আগেও অনেকের কাছে শুনেছিলাম। পত্র-পত্রিকাতেও অনেক লেখা পড়েছি। তবে এবারই প্রথম যাওয়া। শ্রীরায়ের চর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটারের বেশি পথ ভিতরে এসে খাড়া একটি ব্রিজ পড়ল। সম্ভবত এটি বাগারবাড়ী ব্রিজ। ব্রিজ থেকে দুদিকে দুটি পথ দেখতে পেলাম। আমরা বাঁ দিকের রাস্তায় এগোলাম। সব মিলিয়ে দাউদকান্দি ব্রিজ থেকে প্রায় পঁচিশ কি.মি. পথ পেরিয়ে একটু দূর থেকে চোখে পড়ল, দু'তিনটি মিনার। বুঝতে পারলাম চলে এসেছি বেলতলী। গাড়ি নিয়েই সরাসরি ঢুকে গেলাম মাজার গেটের সামনে। লাল ইট বিছানো পিচ ঢালাই বিহীন পথ। দু'পাশে গামছার দোকান। মাজার গেটের কাছাকাছি আগরবাতি, মোমবাতি, ফিতে, সন্দেশ ও তবারকের দোকান। দেখতে পেলাম মাজারের মূল ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ চলছে। ভক্তদের আনাগোনা একেবারেই চোখে পড়ল না। হাতে গোনা কয়েকজনকে দেখলাম মাজার জিয়ারত করছেন। দু'একজনকে দেখলাম মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে দুহাত পেতেছেন। তবে বেলা গড়ালে মানুষের আনাগোনা বাড়বে বলে মনে হল। ভাগ্যবসত সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। আর তাই ঠিক করলাম রাত পর্যন্ত থেকে গানের আসর দেখে যাব। এবার সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সাদুল্যাপুর। শাকিলের এক আত্মীয়র বাড়িতে। বেলতলী থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। দুপুরে পেট শান্ত করে আবার বের হলাম। এবারের গন্তব্য ষাটনল লঞ্চঘাট। সাদুল্যাপুর থেকে ঘন্টাখানেক সময় লাগল। পিচঢালা পথ থেকে নেমে কাঠের সাঁকোতে হেঁটে লঞ্চঘাটে প্রবেশ করতে হয়। হেঁটে যাওয়ার সময় সাঁকোর নীচ থেকে একজন মহিলা ডাকল। তাকিয়ে দেখি দুজন মহিলা নৌকায় মাছ ধরেছে। আমাদের মাছ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল,কিনব নাকি? কথায় কথায় যখন তারা জানল আমরা ঢাকা থেকে এসেছি, মাছের দাম চাইল,১৮০০ টাকা। যার দাম কিনা খুব বেশি হলে ৪০০ টাকা হবে। আমরা কথা না বাড়িয়ে এড়িয়ে চলে গেলাম। লঞ্চঘাটে দীর্ঘ সময় কাটল। প্রতি আধঘন্টা পর পর ঘাটে লঞ্চ ভিড়তে দেখলাম। লঞ্চগুলো একেবারেই ছোট ছোট। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাদপুর। আবার চাদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে ছোট এ লঞ্চগুলো এখানে ভেড়ে। বড় এবং বরিশালগামী দূর পাল্লার লঞ্চগুলো এখানে দাঁড়ায় না। 

সন্ধ্যার হওয়ার পর ষাটনল থেকে সাদুল্যাপুর পৌঁছে বেলতলীর দিকে যাওয়ার পথে গান বাজনার আওয়াজ কানে আসছিল। সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলাম পুরোপুরি জমজমাট অবস্থা। নানান কিসিমের মনোরোগী চোখে পড়ল। শুধু পুরুষই নয় মহিলার সংখ্যাও অনেক। মূল মাজার দালান ব্যতীত পাশের একটি করে বড় কক্ষ বিশিষ্ট আলাদা আলাদা দালানের ভেতরে বসেছে গানের আসর। একেকটা দালানের ভেতর আলাদা আলাদা গানের দল। ভিন্ন ভিন্ন গান গাইছে। বাজছে তবলা, ঢোল, বাঁশি, হারমোনিয়াম। গানের তালে তালে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছে, কেউ বসে চোখ বন্ধ করে তালে তালে মাথা নাড়ছে। আবার কেউ দাঁড়িয়ে গানের তালে তালে শরীর নাড়াচাড়া করছে। কেউ কেউ শুধু হাততালি দিচ্ছে। ভেতরে ফ্যান বন্ধ। জ্বলছে আগর বাতি, মোমবাতি। সব দালানের ভেতরেই একই চিত্র দেখতে পেলাম। সব আসরেই পুরুষের সঙ্গে প্রায় সমান সংখ্যক নারীদেরও তালে তালে নাচতে দেখলাম। ঘুরে ঘুরে দেখার সময় লক্ষ্য করলাম, একটি দালানের ভেতর গানের আসরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে লাল শার্ট পরনে একজন পাগল। মাথায় চুল নেই। প্রথমে দেখি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়াচাড়া করছে। এভাবে কয়েক মিনিট পর পর সে দু'হাত উঠিয়ে সোজাসুজি ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করার সঙ্গে সঙ্গে নাচতেও লাগল। তারপর আবার আগের মতো দাঁড়িয়ে মাথা নাড়াচাড়া করতে থাকল। মাজার এলাকায় দোকানগুলোতে যেকোনও পণ্য কিনতে প্যাকেটে লেখা মূল্যের চেয়ে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হল। একটু পর গান বাজনার আওয়াজ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। দেখলাম সবগুলো আসরের ভেতরেই সবাই খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। এরপর আবার গান বাজনা হবে কিনা তা দেখার জন্য আর অপেক্ষা করলাম না। বাড়ি ফেরার জন্য গাড়িতে উঠে পড়লাম।

Tuesday, August 9, 2016

এখন নারীদের হট বলার মানে প্রশংসা করা!


রফিকুল ইসলাম সাগর  
আগে নারীদের প্রকাশ্যে 'হট' বলার ব্যাপারটা বলা হতো নোংরামি। 
যে নারীকে উদ্দেশ্য করে বলা হতো তার জন্যে হট শব্দ শোনাটা ছিল, লজ্জাজনক। যারা বলতো তাদের বলা হতো, বখাটে। 
আর এখন নারীদের 'হট' বলা মানে, প্রশংসা করা। এছাড়া খোলামেলা পোশাকপড়ার নাম আধুনিকতা। এযুগের নারীদের হট বললে তারা খুশি হয়।
.
একটা উদহারণ:- ভারতীয় টিভি চ্যানেলে একটি রিয়েলিটি শো দেখছিলাম। তাতে ছোট পোশাকে এক নারী অংশগ্রহণকারীর নাচের পার্ফম্যান্সের পর প্রোগ্রামের 'জজ' প্রথমেই বলল, ''ইউ আর লুকিং ভেরি ভেরি হট।'' এমন কমেন্ট শোনার পর অংশগ্রহণকারী নারী খুশিতে কয়েক সেকেন্ড লাফালাফি করল। এরপরে অট্টহাসিতে জজকে ''থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ'' জানালো। 
আর গ্যালারিভর্তি দর্শকরাও খুশিতে ''ও...ও....ও'' করে চিৎকার করল। 

এবার হট প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ক'দিন যাবৎ আকর্ষণীয় ও অধিক আলোচিত যে ইস্যু সেই হাতির কথা-
''ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকেপড়া একটি হাতিকে নিয়ে আমাদের মিডিয়া গুলো যেভাবে আগ্রহ আর সহানুভূতি দেখাচ্ছে। অভাবগ্রস্থ, বিপদগ্রস্থ, ক্ষতিগ্রস্থ ও অসহায় যে মানুষগুলোর আসলে এই সহানুভূতি প্রাপ্য তাদের বেলাতে সহানুভূতির পাল্লা হালকা।'' দু'একদিন ধরে শোনা যাচ্ছে, হাতিটিকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! কেউ কেউ হেডলাইন করছে, হাতিটি কি মারা গেল! কারো হেডলাইনে, হাতিটি কি তাহলে ভারতে চলে গেছে! এছাড়া এইতো একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার হেডলাইনে দেখলাম, ''ভারত থেকে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল হাতিটিকে খুঁজে না পেয়ে চলে গেছে''।
যাই হোক হাতির পরিণতি, ঘটনাটা আসলে দুঃখজনক। আমার মনে হয়, বোবা প্রাণীদের জন্য আমাদের ভেতরে যে মায়া কাজ করে মানুষের জন্য করেনা। আর করলেই অনুভুতিটা দুইটা দুইরকম। 


লেখার এদিকটায় এসে আমার মন যে কথা বলছে...
হাতির সাথে আমাদের চলচ্চিত্রের নায়িকাদের তুলনা করছে। এইতো কয়েকবছর আগেও আমাদের চলচ্চিত্রের নায়িকাদের দেহের যে অবস্থা ছিল তাতে অনেক দর্শকই তাদের হাতির সাথে তুলনা করত। অবশ্য তখন সিনেমার বাজেট কিন্তু হাতির মত মোটা ছিলনা। বোধয় বাজেটের কারণেই স্লিম নায়িকাদের অভাব ছিল। 
এখন অবশ্য আমাদের চলচ্চিত্রের মান অনেক উন্নতি হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে অবাক করার মত পরিবর্তন হয়েছে। যা একসময়ে কল্পনাই করা যেতনা। বাংলাদেশি নায়িকারা এখন বলিউডেও কাজ করে। সেদিন দূরে নয় যেদিন তারা হলিউডেও কাজ করবে। সে যোগ্যতাও এখনকার নায়িকাদের আছে। 

Monday, August 8, 2016

বিচিত্র অভিজ্ঞতার একরাত!

অন্যরকম খোলামেলা কথাবার্তার ভ্রমণ গল্প 


রফিকুল ইসলাম সাগর :: বন্ধু সুমন রাত ১১টায় ফোন করে বলল, তার এক আত্বীয়কে কালিগঞ্জ নামিয়ে দিয়ে আসতে যাবে। আমি সাথে যেতে পারব কিনা জানতে চাইল। আমি মুহুর্তেই রাজি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পরলাম। ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে আমার আবার অন্যরকম নেশা। সুমনের নিজের প্রাইভেট কার। আমাকে বাড়ীর সামনে থেকে এসে নিয়ে গেল। গাড়িতে বসে সুমনের আত্বীয়র সাথে পরিচিত হলাম। নাম জমির। আমাদেরই সমবয়সী। 

গাড়ি ড্রাইভ করেছে সুমন। পূবাইল পার হওয়ার পর পুলিশের চেক পোস্ট। সেখানে একটি দামী কালো গাড়ি থামানো দেখতে পেলাম। গাড়ির বাইরে দুইটা ছেলে একটা মেয়ে। যদিও আমাদের গাড়ি পুলিশ থামতে সিগনাল দেয়নি। আমরা নিজে থেকেই গাড়ি রাস্তার পাশে চাপিয়ে নামলাম জানতে কাহিনী কি! একজন পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, মামা কি হইছে? কাহিনী কি? উত্তরে জানলাম গাড়িতে 'মাল' পাওয়া গেছে (মাল মানে মাদক দ্রব্য)। আমরা আর সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠলাম। চলতি পথে জমির এলাকায় তার প্রভাব সম্পর্কে গল্প করছিল। তার কথাবার্তায় বুঝে নিলাম ব্যাটার ক্ষমতা আছে। সে একটা কথা বারবার বলছিল যে, 'এলাকায় আমগো উপরে কোনো নেতা নাই। আমরাই সব'। কথার মাঝে জমিরের মোবাইলে একটা ফোন এলো। ফোনে যার সাথে কথা বলছে তাকে সম্ভবত কোনো একটা কাজে পাঠিয়েছে, কিন্তু লোকটা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এপাশ থেকে জমির একটা কথা বারবার বলছিল 'মিডিয়া কর', মিডিয়া কইরা কামডা যেমনেই হউক শেষ কইরা আয়। এখানে 'মিডিয়া কর' মানে হচ্ছে কাজটা যে পারবে তার সাথে যোগাযোগ কর। জীবনে প্রথম আমি 'মিডিয়া কর' টাইপের ডায়লগ শুনলাম। এই মিডিয়া কর শব্দটা আমার দারুন পছন্দ হয়েছে। 
চলতে চলতে নানান রকমের কথায় কথায় এর মধ্যে আমরা গৌন্তব্যে পৌছালাম। গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে। জমির ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় বন্ধু বলে। আরও বলে, 'এই এলাকায় আমরা দুজনেই সব। এইখানে যদি এখন পুলিশের গাড়ি আসে আমগো দুইজনকে দেখলে সালাম দিয়া চইলা যাইব।' সাথে জমিরের বন্ধুটাও তাল মিলিয়ে বলল, 'আপনেরা মিয়া এইহানে অহন কাউরে মার্ডার করলেও পুলিশ আমারে দেখলে আপনেগরে ছাইরা দিব। আমার নাম মুন্না।' আমি বললাম, আরে কি কন! মার্ডার করব কারে? মুন্নার হয়ে জমির উত্তর দেয়, আরে কথার কথা কইল আরকি। 
মনে মনে ভাবলাম, খাইছে কি ক্ষমতা। তবে জমিরের কথাবার্তা শুনে আমার সব বিশ্বাস হলেও মুন্না ছেলেটার সব কথাই কেমন যেন চাপা চাপা মনে হচ্ছিল। ওর চেহারা আর পড়নের পোশাক দেখে কোনভাবেই মিলাতে পারছিলাম না ওর এতো ক্ষমতা। চেহারা দেখলেই বুঝা যায় বয়স একেবারে কম এবং কথাবার্তার মধ্যেও একটা বাচ্চামি ভাব প্রকাশ পায়। আমি আর সুমন কানাকানি করলাম, মনে হয় সব চাপা মারছে।
ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১টা কি তার একটু বেশি। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পিচঢালা পথ থেকে প্রায় পঞ্চাশ কদম সামনে একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। উঠোনে লাইটের আলো। চারিদিকে ঝিঝি পোকা ডাকছে। আমরা ঢাকা ফেরার জন্য দুজনের কাছে বিদায় চাইলাম। কিন্তু না ওরা এখন, আমাদের যেতে দিবেনা। দুজনের আবদার, গরিবের বাসায় যেতে হবে। আমরা আপত্তি করলাম। বললাম, নাহ এতো রাতে কারো বাড়িতে যাব না। এরপর জমির সামনের বাড়িটি দেখিয়ে বলল, 'আইচ্ছা ঠিক আছে আসেন এইটা আমার চাচার বাড়ি। চাচা যাইগ্গা আছে। চাচার ঘরে গিয়া বসি। নাইলে খুব কষ্ট পামু।' পাশ থেকে মুন্না বলল, 'ভাই আমরা হারারাইত ঘুমাই না। সহালে বাড়িত গিয়া ঘুমাই।'
সুমন গাড়ি রাস্তার পাশে চাপিয়ে রাখল। বাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে সুমন মুন্নাকে প্রশ্ন করলো, গাড়ি এখানে রাখলে কোনো সমস্যা নেইতো? মুন্না খুব ভাব নিয়ে উত্তর দিল, আরে নাহ গাড়ি কেউ দরত না। আপনেরা মুন্নার কাছে আইছেন বুঝলেন। গাড়ি কেউ নিলে আপনেরে আমি জরিপানা দিমু (একটু জোর গলায় বলল)। এবার সুমন নিশ্চিন্ত মনে বলল, চলেন। 
বাড়িতে ঢুকতে পথের দুপাশে সুপারি গাছ। সাথে সাইডে বড় বড় গজারী গাছ। হেটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। একটি ঘরের দরজার এপাশে দাড়িয়ে জমির ডাক দেয়, কাকা...। ভেতর থেকে সাথে সাথেই উত্তর, কেডা? জমির উত্তর দেয়, আমি জমিরে দরজা খোল। ঢাকা থেইকা মেমান আইছে। 
দরজা খুললেন একেবারে চিকন-চাকন আকৃতির একজন লোক। চোখে চশমা। তিনি সম্ভবত লেখা পড়তে চশমা ব্যবহার করেন। ঘরে ঢুকে দেখতে পেলাম তার হাতে কিসের যেন একটা কাগজ। সম্ভবত কাগজের লেখা গুলো পড়ছিলেন। আমাদের দেখে কাগজটা বিছানার পাশে একটা টেবিলে রাখলেন। তারপর চোখের চশমাটা খুলে সেই কাগজের উপর রাখলেন। এবার জমির চাচার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। চাচা আমাদের বসতে বললেন। বিছানার উপর উঠে বসলাম। 
জমির চাচা সম্পর্কে বলতে শুরু করে, 'এইযে আমার কাকা হের সাথে আমি পুরা ফ্রি মাইন্ডে চলি। একবারে বন্ধুর মতো। আমার কাকা এই পুরা গ্রামের সবচেয়ে বড় নেতা। দুইবার বলল, সভাপতি সভাপতি। হেয় খালি একটা ফুন মারব এক্ষণ পুলিশ আইব।' 
একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম-জমির ও মুন্না দুজনেই প্রথম থেকেই বারবার পুলিশ পুলিশ করছে। তো এরপরে কথার মাঝে চাচার মোবাইলে ফোন এলো। তিনি রিসিভ করে কথা বলছেন। আমরা চুপচাপ বসে সবাই শুনছি। বুঝলাম ফোনে কেউ তার সাথে মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কথা বলছে। কেউ একজন মামলা করেছেন যার নামে মামলা করেছেন তাকে পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে। 
ফোনে চাচা কিছু কথা বললেন এরকম, 'মামলা করতে ট্যাকা কতো দিছে? খবর পাইছত? দশ হাজার ট্যাকা! মামলা করতে দশ হাজার ট্যাকা লাগে নাকি? আমারে এক হাজার ট্যাকা দিলেই এমন মামলা করাইতাম আর বাইরন লাগত না। থাক হেগো ট্যাকা বেশি অইয়্যা গেছে দিছে।' বলে কথা শেষ করলেন। 
আমি জমিরের চাচার দিকে তাকিয়ে ভালোভাবে তাকে দেখলাম। কোনভাবেই তাকে আমার দৃষ্টিতে নেতা নেতা মনে হচ্ছিল না। আবার মনে করলাম নাহ! লোকটা অনেক বড় নেতা হলেও হতে পারে। গ্রামের নেতা তো। 
এরমধ্যে জমির তার এক বন্ধুকে ফোন করে বলল, 'ঢাকা থেইক্কা মেমান আইছে খাওনের কিছু নিয়া আয়। এক্ষণ আবি। দেরী করবি না। তুই তর ট্যাকা দিয়া নিয়া আয়, আইলেই আমি দিয়া দিতাছি।' আমি প্রশ্ন করলাম, এতো রাতে দোকান খোলা পাবে? সাথে সাথেই মুন্নার উত্তর, খুলা না থাকলেও খুলাইব। 
প্রায় ঘন্টা খানেক পর মোটর সাইকেল চালিয়ে একজন বাড়ির ভেতর ঢুকলো। তখন জমির ঘর থেকে বের হলো। মিনিট পাঁচেক পর মোটর সাইকেল স্টার্ট দেয়ার শব্দ শুনলাম। বুঝতে পারলাম মোটর সাইকেল চালিয়ে যে এসেছিল সে জমিরের সাথে কথা বলে চলে গেল। জমির ঘরে ঢুকলো। ওর চেহারায় একটু রাগ রাগ ভাব খেয়াল করলাম। ঘরে ঢুকেই জমির চাচার কাছে নালিশ করলো, 'চাচা, সবুইজ্জার কামডা দেখছেন এতক্ষণ পরে আইয়্যা কয় হের কাছে ট্যাহা নাই। এই কয়ডা ট্যাহা হের কাছে নাই? ওরে কি কেউ বাকিও দিতনা? আমার কাছ থেইকা আইয়্যা ট্যাহা নিয়া গেল।' 
জমিরের নালিশ শুনে চাচা বললেন, 'সবুইজ্জার কাছে ট্যাকা থাকব কেমনে! সারাদিন জুয়া খেলে। ঘরের সব জিনিস জুয়া খেইল্লা বেচ্ছে। দেখ অহন আবার গিয়া জুয়া খেলতে বইছে।' চাচার এসব কথা শুনে সবুজের মোবাইলে ফোন করে জমির। ওপাশ থেকে রিসিভ করেনা। অসংখ্য বার ট্রাই করার পর প্রায় মিনিট বিশেক পর ফোন রিসিভ করলো। বলল, পাচ মিনিট লাগবে আসতে। পাচ মিনিট পেরিয়ে ত্রিশ মিনিট হয়ে গেল সবুজের কোনো খবর নাই। ফোন করলে রিসিভ করেনা। একঘন্টা পর আবার ফোন রিসিভ করলো। এবার বলল, এইতো আর দুই মিনিট লাগবে। দুই মিনিট শেষ হলো আরও একঘন্টা পর। মোটর সাইকেলের আওয়াজ শুনে মুন্না বলল, আইছে...। একটা ছেলে ঘরে ঢুকলো। এই ছেলেটার নামই সবুজ। মুন্নার হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে 'একটু কাম আছে। আইতাছি।' বলে সে কেটে পড়ল। 
ব্যাগের ভেতর থেকে মুন্না দুই প্যাকেট বিস্কুট আর এক লিটার প্রাণ আপ এর বোতল বের করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ভাই নেন খান। বিস্কুট খাওয়া শুরু করলাম। চাচা একটি বিস্কুট হাতে নিয়ে কয়েক লাইন জ্ঞানের কথা বললেন। কথা গুলো হলো- 'এই যে আমরা প্রত্যেক দিন ভাত, মাছ, মাংশ, তরকারি খাই। প্রথমে বাজার কইরা আনন লাগে। আননের পরে মহিলারা ছুইলা-কাইডা, ধুইয়্যা এগুলা চুলার সামনে হাজির করে। পরে চুলাত বহায়। এরপরে রান্ধন অয়। তারপরে গিয়া প্লেটে কইরা আমগো সামনে দেয়। এতো কষ্ট কইরা জিনিসটা তৈয়্যার অয়। খাইতে কিন্তু লাগে মাত্র পাচ মিনিট।' চাচার এমন উদহারণ দেয়ার কারণ বুঝতে আর বাকি রইলো না। 
খাওয়া শেষ করে আমি আর সুমন ঢাকা ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরলাম। চাচার কাছে বিদায় নিলাম ঘরের ভেতরেই। জমির আর মুন্না আমাদের এগিয়ে দিতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গাড়ি পর্যন্ত এলো। ঠিক তখনি অনেকটা দূরে একটা গাড়ির হেড লাইটের আলো চোখে পড়ল আমাদের সবার। দূর থেকে ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না গাড়িটা কোন ধরনের। গাড়িটা আমাদের দিকে এই পথেই আসছে। এই মুহুর্তে জমির তারাহুরা করে আমাকে আর সুমনকে বলল, ভাই আপনেরা একটু বাড়ির ভিতরে যান। আমি বললাম, কোনো সমস্যা? জমির বলল, না সমস্যা না। একটু পরে যান। এখন চাচার ঘরে যান। ফোন করলে বাইরইবেন। 
কথা না বাড়িয়ে আমি সামনে সুমন পিছনে বাড়ির ভেতরে যেতে হাটা শুরু করলাম। মাঝ পথে সুমন বলল, দাড়া তো দেখি কাহিনী কি! দাড়িয়ে গেলাম। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি সুমন একটা গজারী গাছের পেছনে দাড়িয়ে মাথা একটু বাঁকা করে উকি দিয়ে দেখছে। আমাকে ইশারা করলো, চুপ কোনো কথা বলবি না। আমিও ঠিক একই পজিশনে দাড়িয়ে উকি দিয়ে রইলাম। দেখলাম, জমির ও মুন্না আমাদের গাড়ির ওখানেই দাড়িয়ে আছে। দূর থেকে যে গাড়িটা এদিকে আসছে ওদের দৃষ্টি সেদিকে। গাড়িটা একেবারে কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলাম জমির আর মুন্না দুইজন দুইদিকে দৌড় দিল। আমরা আড়াল থেকে দেখলাম, গাড়িটা ছিল পুলিশের। বুঝলাম ওরা দুইজন পুলিশ বুঝতে পেরেই দৌড় দিয়েছে। পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর জমিরের ফোন পেয়ে এসে দেখলাম ওরা দুজন এমন ভাব করে দাড়িয়ে আছে যেন এতক্ষণ এখানেই দাড়িয়ে ছিল। আমরাও ওদের প্রকাশ করিনি যে আমরা সব দেখেছি। এই দৃশ্য দেখার পর আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না, বেটারা কতবড় চাপাবাজ। পাঠক আপনারাও নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি চাপাবাজি গুলোই হজম করলাম।
ঘড়ির কাটায় তখন সাড়ে চারটার মতো বাজে যখন আমরা ঢাকা ফিরতে রওনা করলাম। আমি আর সুমন শেষের ঘটনা মনে করে করে গোটা পথে হাসতে হাসতে বাড়ি পৌছালাম।

Tuesday, February 16, 2016

মালয়েশিয়ার 'ইন্দুরের' গল্প

রফিকুল ইসলাম সাগর
মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে ইন্দোনেশিয়ানরা 'ইন্দুর' নামে ব্যাপক পরিচিত। অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের অবস্থার দিক থেকে মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে এগিয়ে। তবে শুনেছি, চলচ্চিত্র ও খেলাধুলায় মালয়েশিয়ার চেয়ে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ভালো। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের মতো ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ। দুই দেশের মানুষ শারীরিক গঠন, আকার, গায়ের রঙসহ সব মিলিয়ে দেখতে একই রকম। যে কারণে বোঝার উপায় নেই_ কে মালয়েশিয়ান আর কে ইন্দোনেশিয়ান। শুধু পরিচয় প্রকাশ করলেই জানা যায়। দু'দেশের ভাষাও একই রকম। 
সিঙ্গাপুর আর থাইল্যান্ডের মানুষদের কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়া আসার প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। তবে মালয়েশিয়ায় আছে প্রচুর সংখ্যক ইন্দোনেশিয়ান। স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় প্রতিদিনই ইন্দোনেশিয়ানরা মালয়েশিয়ার বর্ডার অতিক্রম করে বৈধ-অবৈধ উপায়ে প্রবেশ করে। মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা একটা কথা বলাবলি করে, 'অবৈধ ইন্দোনেশিয়ানদের মালয়েশিয়ার পুলিশ গ্রেফতার করে সকালের লঞ্চে ফেরত পাঠালে রাতে আরেক লঞ্চে মালয়েশিয়া চলে আসে।' 
এবার আসা যাক একটি গল্পে। এক বাংলাদেশি ছেলে ইন্দোনেশিয়ান মেয়ের প্রেমে পড়ে। প্রথমদিকে ছেলেটার কাছে নিজের দেশীয় পরিচয় গোপন করে মেয়েটি নিজেকে মালয়েশিয়ান হিসেবে পরিচয় দেয়। পরবর্তীকালে ছেলেটা যখন জানল মেয়েটা ইন্দোনেশিয়ান, তখন দু'জনের মধ্যে হৃদয় দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে। ছেলেটা আরও জানতে পারে, মেয়েটির মালয়েশিয়া থাকার বৈধ ভিসা নেই। যদিও বাংলাদেশি ছেলেটাও অবৈধ। ছেলেটা ভেবেছিল, মালয়েশিয়ান মেয়ের কারণে এ দেশে স্থায়ীভাবে থাকার একটা উপায় হবে। কিন্তু সে পড়ল কিনা ইন্দোনেশিয়ান মেয়ের প্রেমে। একেই বুঝি বলে ভাগ্য। প্রেম হওয়ার পর দু'জন একসঙ্গে একই বাড়ির একটি ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকতে শুরু করে। দু'জনে কাজ করলেও ছেলেটা একাই দু'জনের খাওয়া-দাওয়া, বাড়ি ভাড়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করে। মেয়েটা যা বেতন পায় পুরোটাই ইন্দোনেশিয়ায় নিজের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর ছেলেটা তিন মাস বাংলাদেশে মা-বাবার কাছে টাকা পাঠায় না। একদিন গাঁয়ের সহজ-সরল মা ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় জানতে চান_ 'বাবা, কোম্পানি কি বেতন দেয় না? কাজ কি ঠিকমতো করিস না? টাকা পাঠাস না কেন? মায়ের প্রশ্নে ছেলে উত্তর দেয়_ 'মা টাকা তো কামাই করি; সব টাকা ইন্দুরে খেয়ে ফেলে।' এবার মা আশ্চর্য ভঙ্গিমায় বলেন_ 'কস কী বাবা! ইন্দুরে খেয়ে ফেলে!' ছেলের উত্তর_ 'হ মা। ইন্দুরে খেয়ে ফেলে।' মায়ের পাল্টা প্রশ্ন_ 'এত ইন্দু-র-র-র-র-র? ইন্দুর কি অনেক বড়? ওষুধ দিলে মরে না?' ছেলের উত্তর_ 'হ মা। অনেক বড় ইন্দুর। ওষুধ দিলেও মরে না।' 
এবার মা ছেলেকে সান্বস্ননা দেন_ 'থাক বাবা; মন খারাপ করিস না। এত কষ্টের টাকা; এখন থেকে টাকা-পয়সা সাবধানে রাখিস।' ছেলে ঠিক আছে বলে লাইনটা কেটে দেয়।

Sunday, January 24, 2016

যখন প্রথম দেশে রেমিট্যান্স পাঠাই

রফিকুল ইসলাম সাগর

বিদেশ থেকে প্রবাসীদের আয় করা বৈদেশিক মুদ্রা বৈধভাবে দেশে পাঠানোকে রেমিট্যান্স বলে। রেমিট্যান্স শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রবাসীদের প্রেরিত আয়। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।

বৈধভাবে প্রবাসীদের পাঠানো আয় সেটা যে দেশ থেকে পাঠানো হয় সে দেশের মুদ্রা বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট হয়ে আসে। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে রেমিট্যান্স অনেক বড় ভূমিকা রাখে। অনেক প্রবাসী অবৈধভাবে দেশে তাদের আয় পাঠান। যাকে বলে, 'হুন্ডি'। এ ধরনের আদান-প্রদান হয় ব্যক্তিগতভাবে। অধিকাংশ প্রবাসী সময় বাঁচাতে হুন্ডি করে দেশে টাকা পাঠান। এর মধ্যে এক শ্রেণীর প্রবাসী অবৈধভাবে বিদেশে থাকেন। তারা অবৈধভাবে হুন্ডি করে মুদ্রা পাঠান। আরেক শ্রেণীর প্রবাসীর কাছে হুন্ডি করে পাঠানো সহজ মনে হয়। তবে কারণ যাই হোক, হুন্ডির মাধ্যমে আদান-প্রদানে দেশের ক্ষতি। আমার প্রবাসী হওয়ার শুরুতে জীবনের প্রথম যেদিন নিজের পরিশ্রমে অর্জিত আয়ের কিছু অংশ দেশে বাবার কাছে পাঠিয়েছিলাম ২০১১ সালে। সে অনুভূতিটা ছিল অন্য রকম। কী যে এক তৃপ্তি পেয়েছিলাম! সেটা ছিল আমার জীবনের স্মরণীয় এক আনন্দময় মুহূর্ত। জীবনে অনেক রকম আনন্দের স্বাদই তো অনুভব করেছিলাম। তখন মনে হয়েছে, যেন এ রকম একটা আনন্দ অনুভব করাই বাকি ছিল। প্রথম রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখলাম। ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে সে মুহূর্তে বাবা মনে হয় ভেবেছিলেন_ ছেলে আমার আর অকর্মা নেই। মনে মনে বাবাও খুব আনন্দ পেয়েছিলেন এবং আমাকে নিয়ে গর্ব হয়েছিল তার। একজনের কাছে শুনেছিলাম, আমার পাঠানো টাকা পাওয়ার পর বাবা কয়েকদিন তার বন্ধুদের কাছে ছেলের টাকা পাঠানোর গল্প শুনিয়েছেন। এ কথা শুনে দারুণ রকমের ভালো লাগা থেকে নিজের অজান্তেই আমার চোখে জল এসেছিল। আমি জানি, আমার মা-বাবা সেদিন টাকা পাওয়ার চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিলেন আমি কিছু করছি বলে। আমাকে নিয়ে অনেকটা চিন্তামুক্ত হয়েছিলেন। সম্ভবত এমন অনুভূতি বিশ্বের সব প্রবাসীর পাঠানো টাকা পাওয়া মা-বাবার। 

মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অল্প কথা

রফিকুল ইসলাম সাগর 

মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সে সময়কার তোলা পুরনো ছবি অথবা ভিডিও চিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্পের বই বরাবরই আমাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করে। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। সে সময়ের ১৬ বছর পরে আমার জন্ম। আমার ঘনিষ্ঠ মুরব্বিজন যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, যুদ্ধ করেছেন সুযোগ পেলেই তাদের কাছ থেকে যুদ্ধের গল্প শুনতে বসে পড়ি। শোনার ফাঁকে ফাঁকে তাদের নানান রকমের প্রশ্ন করি। এতে যিনি গল্প বলেন তিনি শুনিয়ে আনন্দ পান আর আমি অজানা অনেক কিছু জানতে পারি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের গল্প, যুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এরপরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী সময়ের গল্প সব মিলিয়ে সে সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু জানার চরম কৌতূহল আমার। এসব গল্প আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনি। শুধু তাই নয়, শোনার সময় সে মুহূর্ত আমি যেন বাস্তবে অনুভব করি। শোনা ঘটনাগুলোর চিত্র আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। খুব আফসোস হয় আমার আমি কেন তখন ছিলাম না। আমি কেন যুদ্ধ করলাম না।
এক কথায় স্বাধীনতা আমাদের অনেক বড় অর্জন। মুক্তিযোদ্ধারা অসম্ভবকে সম্ভব করে বিশ্বের মানচিত্রে লিখেছিলেন বাংলাদেশের নাম। সেই সাথে বিশ্ব জেনেছে বাঙালিরা কত শক্তিশালী। বাঙালি দুর্বল নয়। বাঙালি চাইলে সব পারে। বিশ্বের বুকে আমরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্যেও আন্দোলন করেছি। ৫২’র সেই বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনেও আমাদের বিজয় হয়েছিল। আমি বাঙালি, আমি বাংলাভাষী, আমি বাংলাদেশি। এই পরিচয় আমি যাদের আত্মত্যাগের, যাদের রক্তের এবং যেসব মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে পেয়েছি তাদের অবদান কোনোদিন ভুলবার নয়। তারাই হলেন বাংলাদেশের প্রকৃত মালিক। 
আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক যিনি তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ মহানায়কের সম্পর্কে আমি যত জেনেছি-শুনেছি ততই তার প্রতি আমার মুগ্ধতা বেড়েছে। তিনি ছিলেন অন্যরকম ক্ষমতার অধিকারী মানুষ। তার আহ্বানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। মানুষ এসেছিল বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথের সন্ধানে। এদিন অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। প্রদত্ত এ ঐতিহাসিক ভাষণ অসংখ্যবার শুনেছি। যত শুনি তত শুনতে ইচ্ছা করে, তৃপ্তি মেটে না। ৭ মার্চ যার কথা শুনতে নিজ ইচ্ছায় এত মানুষ রেসকোর্স ময়দানে হাজির হয়েছিল তিনি কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারেন না। সেদিনের ভাষণে বলা বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী গর্জনভরা কথাগুলো আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে আমার মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি জাগ্রত হয়। একটা মানুষ যার কথায় কি ভয়ঙ্কর রকমের আকর্ষণ শক্তি ছিল। যার কথা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করেছিল, রক্ত গরম করে দিয়েছিল, শত্রুর মোকাবেলা করার সাহস-শক্তি যুগিয়েছিল। অতঃপর মানুষ জীবনের পরোয়া না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে। তাই নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু অন্যরকম ক্ষমতার অধিকারী মানুষ ছিলেন। ভাষণ তো সব নেতারাই দেন কিন্তু কজন নেতার ভাষণ এভাবে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে পারে? রক্ত গরম করতে পারে? শত্রুর মোকাবেলা করার সাহস-শক্তি জাগায়?  


Wednesday, January 13, 2016

স্কুল ম্যাগাজিন এবং স্বপ্ন ভঙ্গ

রফিকুল ইসলাম সাগর 


ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ের কথা। আমাদের স্কুল থেকে ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হবে, একদিন ক্লাস চলাকালীন এমন ঘোষণা দেয়া হলো। জানতে পারলাম, ম্যাগাজিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত কিছুসংখ্যক লেখা ও আঁকা স্থান পাবে। এতে লেখা দিতে আগ্রহীদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে লেখা/আঁকা জমা দিতে আহ্বান করা হলো। লেখা/আঁকা জমা দিতে হবে আবুল কাশেম স্যারের কাছে। ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য তিনিই লেখা নির্বাচিত করবেন। এ কাজে স্যারকে সহযোগিতা করতে গোটা স্কুল থেকে দুজন শিক্ষার্থীকে বাছাই করা হলো। ভাগ্যক্রমে সে দুজনের মধ্যে একজন ছিলাম আমি। আরেকজন আমারই সহপাঠী। তবে এখানে যে কথা না বললেই নয়, আমার মধ্যে বিশেষ কোনো প্রতিভা থাকায় যে স্যার আমাকে বাছাই করেছিলেন তা নয়। আসল ঘটনা হলো, স্যার তাকে সহযোগিতা করার জন্য ক্লাস নাইন থেকে দুজন শিক্ষার্থীকে নিবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তিনি যখন আমাদের ক্লাসে এসে প্রস্তাব দিলেন, ‘যারা আমাকে সহযোগিতা করতে চাও হাত উঠাও।’ স্যারের কথা শুনে আমি হাত উঠালাম। মনে করেছিলাম আরও অনেকেই হাত তুলবে। কিন্তু গোটা ক্লাসের মধ্যে মাত্র দুজন হাত তুলেছি। এমন চিত্র দেখে শুধু আমিই না, স্যারও অবাক হয়েছিলেন। আমি ছিলাম ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসা ক্যাটাগরির এবং প্রতিদিন পড়া না পারা টাইপের ছাত্র। আমার মাঝে এমন অসাধারণ(!) প্রতিভা থাকায় স্যার প্রথমে আমাকে নিতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু ক্লাসের কোনো গুডবয়কে রাজি করাতে না পেরে আমার মতো ব্যাডবয়কে নিলেন বাধ্য হয়েই বলা চলে। আর আমিও যেন হাত উঠিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম। 

স্যার আমাদের দুজনকে সাথে করে শিক্ষকরুমে নিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলেন। তার পক্ষ থেকে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লেখা/আঁকা সংগ্রহ করার দায়িত্ব পেলাম আমরা। টিফিন টাইমে প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে লেখা/আঁকা সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। কেউ কেউ নিজের লেখা জমা দেওয়ার জন্য আমার ক্লাসে আসছে। এসে যখন আমাকে খোঁজ করত তখন আমার ভাব দেখে কে! মজার ব্যাপার হলো ১ম, ২য়, ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও ওদের কচি হাতের লেখা/আঁকা জমা দেয়া শুরু করল। ওদের চোখে দেখতে পেতাম অন্যরকম আগ্রহ আর আনন্দ। ওদের মধ্যে কারও কারও লেখা/আঁকা ছিল বড়দেরও ভাবিয়ে তুলবার মতো। আমার এক বন্ধু সজীব প্রতিদিন একটি করে কবিতা জমা দিত। বিভিন্ন গান থেকে দুই কলি অথবা তিন কলি চুরি করে বন্ধু দশ লাইনের কবিতা লিখত।
লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি সবচেয়ে আনন্দ পেতাম যখন লেখা জমা দিতে এসে কেউ লেখা ম্যাগাজিনে ছাপানোর জন্য আকুতি-মিনতি করত, যেন লেখা নির্বাচন করার ক্ষমতা আমারই হাতে। এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে তখন অনেক ক্ষমতাবান মনে হতো। প্রতিদিন সংগ্রহ করা লেখাগুলো স্কুল ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। সপ্তাহে একবার সংগ্রহ করা সব লেখা/আঁকা একত্রে স্যারকে বুঝিয়ে দিতাম। এভাবে লেখা সংগ্রহের কাজ করলাম এক মাস। এই কাজ করতে গিয়ে নিজের মধ্যেও লেখক হওয়ার স্বপ্ন জেগে উঠল। আর তাই প্রতি সপ্তাহে সবার লেখার সাথে নিজের দু-চারটি লেখা ঢুকিয়ে দিয়ে স্যারের হাতে তুলে দিতাম। এক মাসে শুধু নিজের লেখাই জমা দিলাম কমপক্ষে ৫০টি। ধরে নিয়েছিলাম ম্যাগাজিনে আমার কমপক্ষে দশখানা লেখা তো প্রকাশ হবেই। আরও ভাবলাম, স্যারের জন্য কাজ করেছি সেই সূত্রে স্যার তো আমার লেখাগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখবেন এটা তো কনফার্ম। 


লেখা সংগ্রহ শেষে অতঃপর নির্বাচিত লেখা/আঁকা নিয়ে ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজ শুরু হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ম্যাগাজিন সবার হাতে হাতে পৌঁছে যাবে। ম্যাগাজিন হাতে পাওয়ার চিন্তায় আমার রাতে ঘুম হয় না। অবশেষে একদিন ম্যাগাজিন হাতে পেলাম আর কি যে খুশি হলাম। অতি আগ্রহে প্রথম পাতা উল্টালাম, পরে দ্বিতীয় পাতা উল্টালামÑ একে একে শেষ পাতা পর্যন্ত দেখলাম। একি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! আমার নাম কোথাও দেখতে পেলাম না। সম্ভবত আমার দেখতে ভুল হয়েছে, কোনো পাতা উল্টানোর সময় মনে হয় একসাথে দু-তিন পাতা উল্টিয়েছি এই ভেবে আবার শুরু থেকে পাতা উল্টিয়ে সূক্ষ্মভাবে দেখা শুরু করলাম। এবার হাতের আঙ্গুলে থুতু লাগিয়ে পাতা উল্টাতে লাগলাম। শেষ পাতা পর্যন্ত আবারও দেখলাম কোথাও আমার নাম নেই। আবার মনে হয় দেখায় ভুল ছিল। নাহ! এবার মনে হলো, এই ম্যাগাজিনেই সমস্যা। অন্য আরেকটি ম্যাগাজিন নিলাম। তাতেও আমার লেখা তো দূরে থাক কোথাও আমার নামই নেই। আমার একটি লেখাও প্রকাশ হলো না, লজ্জায় মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়ল। অপমানে এবার বন্ধুদের সামনে নিজের মুখখানা করুণ-অসহায়ের মতো অনুভব করলাম। মুহূর্তেই যেন আকাশ থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়লাম। কয়েকদিন পর এক চাচার বাসায় বেড়াতে গেলাম। সেখানে চাচি প্রশ্ন করলেন, স্কুল ম্যাগাজিনে তোমার লেখা কোনটা? চাচাতো বোন একই স্কুলে পড়ায় চাচির হাতেও পৌঁছে গিয়েছিল ম্যাগাজিন। চাচির প্রশ্নে আমার যেন কাটা ঘায়ে লবণ দেয়ার মতো জ্বালা লাগল।



Monday, December 28, 2015

বট গাছে ভূত

রফিকুল ইসলাম সাগর
 
পাড়ার অনেকেই বলাবলি করে বাড়ীর পেছনের বট গাছটায় নাকি ভূত থাকে। প্রায় শত বছরের পুরোনো বট গাছটাকে দেখতেও একটা ভূতুরে ভাব আছে। গোটা বট গাছেই ফুটোর মতো অসংখ্য গর্ত। অনেকে বলে এই গর্ত গুলোতে সাপের বাসা। ছোট থাকতে আম্মাও এই বট গাছটাকে নিয়ে ভয় দেখাত। বট গাছের ওখানে একা একা যেতে নিষেধ করত। বলতো, বট গাছ থেকে ভূতে ধরবে, সাপে কামড়াবে। কথায় আছে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি। আম্মার নিষেধ শুনতাম না, বট গাছটার আশেপাশেই বেশি ঘুরাঘুরি করতাম। বন্ধুরা মিলে বট গাছের ডালে দড়ি বেধে টারজানের মতো ঝুলতাম। আবার দোলনা বানিয়ে দোল খেতাম।  
বট গাছ ঘেষে যে রাস্তা তাতে দিনের বেলায়ই মানুষের আনাগোনা কম থাকে। আর রাতের বেলায় তো একেবারেই কমে যায়। চার-পাচ জন একসাথে হলে এই রাস্তা ব্যবহার করে, একা হলে বিকল্প রাস্তা দিয়ে যায়। বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করলে অনেক ঘুরে আসতে হয়। অনেকে সাহস করে একা বট গাছের রাস্তা ব্যবহার করেন। যারা করেন তারা মনে প্রচন্ড ভয় রেখে বট গাছ অতিক্রম করেন, বট গাছ অতিক্রম করে যেন শান্তির নিশ্বাস ফেলেন। মনে মনে বলেন আহ! বাচলাম। প্রায়ই দেখা যায় বট গাছের সামনে এসে অনেকে দৌড় দেন। বিশেষ করে দুপুরে ও রাতে এমন দৃশ্য দেখা যায়। আরেক শ্রেনীর লোক যারা কোনো কিছুকেই ভয় পাননা তারা রাস্তাটি ব্যবহার করেন। অনেকে রাতের বেলা দূর থেকে এ শ্রেনীর লোককে বট গাছের নিচ দিয়ে হেটে যেতে দেখেই ভূত যাচ্ছে ভাবেন।
বট গাছটিকে নিয়ে অনেক ভৌতিক ঘটনা শুনলেও আজ পর্যন্ত বট গাছে ভূত দেখিনি। ভূত খুজতেও গিয়েছি কিন্তু ভূল মামারা দেখা দেয়নি। ভূত মামারা মনে হয় শুধুমাত্র তাদের আসল ভাগিনাদেরই দেখা দেয়।
আমার বয়স যখন ১২-১৩ বছর। পাড়ার বড় ভাই ছোট ভাই মিলিয়ে পনের থেকে বিশ জনের গ্রুপ আমাদের। গোটা এলাকা দাঁপিয়ে বেড়াতাম। অনেক বেশি দুষ্টু ছিলাম। টইটই করে ঘুরে বেড়িয়ে ঘরে ফিরলেই শুনতাম, আম্মার কাছে পাড়ার লোকেদের দেয়া পাহাড় সমান বিচারের কথা। আম্মাকে খুব একটা ভয় পেতাম না, আম্মার কাছে জমা বিচারের পাহাড় এক ফুতেই গুড়িয়ে দিতাম। তখন আম্মা আব্বার কাছে বলার মিছে ভয় দেখাত তবে জানতাম এমন কাজ আম্মা করবে না। 
প্রতিদিন রাতেই কারেন্ট চলে গেলে চোর পুলিশ খেলতাম। এ খেলায় যারা চোর হতাম লুকাতাম বট গাছের আশেপাশের ঝোপে-ঝাড়ে। কেউ কেউ বট গাছের ডালেও উঠে লুকাত। যে পুলিশ হতো তার পক্ষে সবাইকে খুঁজে পাওয়া ছিল কষ্টকর। কারেন্ট না আসা পর্যন্ত সে শুধু খুজতই। 
একদিন গ্রুপের সবাই চোর-পুলিশ খেলার সময় প্লান করলাম, বট গাছের এখান দিয়ে রাতের বেলা যারা চলাচল করে তাদের ভয় দেখাব। আইডিয়াটি প্রথম বের হয়েছিল সিনিয়র জুয়েল ভাইয়ের মাথা থেকে। যেই কথা সেই কাজ। কিভাবে কি করব সব ঠিক করে ফেললাম। পরের দিন রাত দশটায় আমাদের ভয় দেখানোর মিশন। একে একে সবাই একত্র হলাম। একসাথে গেলাম বট গাছের দিকে। সাথে ঘর থেকে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলাম পড়নের জন্য সাদা কাপড় আর বোতল ভর্তি পানি। চার-পাচ জন সাদা কাপড় পড়ে গাছে উঠলাম। আলাদা আলাদা ডালে বসলাম। হাতে পানির বোতল। বাকিরা সবাই পাশের ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে পড়ল মজা লুটবে বলে। এবার অপেক্ষা পথচারীর জন্য। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ভয় দেখানোর জন্য মানুষ খুঁজে পেলাম। তিন-চারজন লোক বট গাছের নিচে আসতেই তাদের উদ্দেশ্য করে উপর থেকে পানি ছুড়ে মারলাম। পানি যখন তাদের উপরে পড়ল উপরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সাদা কাপড়ে ভূত বসে আছে আর সেকি দৌড়.... তা দেখে আমাদের হাসতে হাসতে গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার দশা। এরপরেই আরো দু'জন বট গাছের নিচ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল। তাদেরকেও উদ্দেশ্য করে পানি ছুড়ে মারার পর ইহ হি হি হি... করে হাসতে শুরু করলাম। দু'জনের একজন তো জুতা খুলেই দৌড়ালো। পরের দিন তাদের মাধ্যমে গোটা এলাকায় ছড়িয়ে যায় বট গাছে ভূত। তারা যখন আমাদেরকেই সেই ভূত দেখার অভিজ্ঞতা শোনালো তখন হাসি চাপিয়ে রাখা দায় হয়ে পরেছিল। ওদিনের পরে প্রায়ই আমরা এরকম ভয় দেখাতাম। সেই স্মৃতি গুলো প্রায়ই মনে করে করে হাসি। 


চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘প্রিয় লোহাগাড়া’ ম্যাগাজিন এর বিজয় দিবস সংখ্যা’ ১৫-তে প্রকাশিত 

সিগারেট

রফিকুল ইসলাম সাগর

এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট কিনে আনার জন্য বাড়ীর দারোয়ানকে টাকা দিয়ে দোকানে পাঠালেন জামাল সাহেব। যদিও তিনি ধুমপান করেননা। 
জামাল সাহেবের দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম জহির। আর ছোট ছেলের নাম জমির। স্ত্রী, দুই ছেলে ও বড় ছেলের বউসহ একই ফ্লাটে থাকেন জামাল সাহেব। বাড়িটা নিজের। ছয় তলা। তারা থাকেন তৃতীয় তলায়। প্রতি তলায় ২৮০০ স্কয়ার ফিটের বিশাল ফ্লাট। 
বড় ছেলে জহিরের মেয়ে জামাল সাহেবের একমাত্র নাতনী চার মাস বয়সের শিশু নাবিলা। ও এখনো বসতে শিখেনি। 
দারোয়ান চাচা যখন সিগারেটের প্যাকেট হাতে ফিরলেন তখন গেইটের সামনে জামাল সাহেবের ছোট ছেলে জমির দেখে বলল, চাচা বেনসন সিগারেট কার জন্যে? 
: তোমার আব্বা আনতে পাঠালো। উত্তর দিলেন দারোয়ান চাচা। 
: জমির এবার প্রশ্ন করলো, বাসায় আব্বার কোনো গেষ্ট আসছে নাকি?
: দারোয়ান চাচার উত্তর, কাউকে দেখতি পেলাম নাতো।
ও আচ্ছা ঠিক আছে যান দিয়ে আসেন এই বলে জমির মনে মনে ভাবছে, 'আব্বা তো ধুমপান করেননা। তাহলে সিগারেট কার জন্য আনাইলো? কাহিনী কি? নাকি আব্বায় লুকাইয়্যা লুকাইয়্যা সিগারেট খায়? হ্যা মনে হয় লুকাইয়্যা লুকাইয়্যা সিগারেট খায়। আর আমগো কাছে সাদু সাজে।' এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ী থেকে বাইরে বেরিয়ে যায় জমির। 

ওদিকে জামাল সাহেব সিগারেটের প্যাকেট হাতে পেলেন। পকেটে ঢুকালেন প্যাকেটটা। ঘড়ির কাটায় বেলা সাড়ে বারোটা। ছেলের বউ টুম্পা এবং নিজের স্ত্রী দুজনেই রান্না ঘরে ব্যস্ত। দুই ছেলেই বাড়ীর বাইরে। তবে বড় ছেলে ফেরার সময় হয়েছে। বড় ছেলের ঘরে গিয়ে জামাল সাহেব দেখতে পেলেন চার মাস বয়সি নাতনী বিছানায় আরাম করে ঘুমোচ্ছে। তিনি সিগারেটের প্যাকেট থেকে সবগুলো সিগারেট বের করলেন। সিগারেট গুলো বিছানায় নাতনীর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখলেন। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে নাতনীর ঘুম ভাঙ্গে। খুব শান্ত শিশু ঘুম ভাঙ্গার পর অন্যান্য শিশুদের মতো কান্না করেনা। জামাল সাহেব বারান্দায় দাড়িয়ে বড় ছেলে জহিরকে দেখতে পেলেন রাস্তায় সিগারেট টানতে টানতে বাড়ীর দিকে আসছে। তিনি তারাহুরা করে ছেলের ঘর থেকে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলেন। 

জহির ফিরল। নিজের ঘরে গিয়ে দেখল, তার মেয়ের চারিদিকে সিগারেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অবুজ শিশুটি বিছানায় গড়াগড়ি করছে আর সিগারেট দিয়ে খেলছে। হাত দিয়ে সিগারেট চটকাচ্ছে। একটি সিগারেট মুখের ভেতরে ঢুকিয়েছে। এমন দৃশ্য দেখে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে টুম্পা.....টুম্পা....আম্মা....আম্মা....বলে চিত্কার শুরু করে জহির। চিত্কার শুনে রান্না ঘর থেকে দৌড়ে আসে টুম্পা সাথে আম্মাও এলো। কি হয়েছে প্রশ্ন করল? পাশের ঘর থেকে জামাল সাহেবও এলেন। বললেন, কিরে কি হয়েছে? ঘরে এসেই এমন চিল্লা চিল্লি শুরু করলি কেন? 
জহির বলল, এখানে এতো সিগারেট কিভাবে এলো? নাবিলা সিগারেট মুখেও দিয়েছে। 
জামাল সাহেব বললেন, 'তোর মেয়ে একটা দুইটা সিগারেট মুখে দিয়েছে এতেই তোর এই অবস্থা। তোর খারাপ লাগছে, যার জন্য চিল্লাইয়া পুরা বাড়ী মাথায় তুললি। আর তুই যে এতো বছর ধরে প্রতিদিন এতগুলা কইরা সিগারেট টানিস আমাদের কেমন লাগে? সন্তান কি জিনিস বুঝতে পেরেছিস? তোর সন্তানকে সিগারেট খেতে দেখে তোর ভিতরটা যেমন পুড়াচ্ছে। আমার সন্তানের জন্যেও আমার এরকম পোড়ায়।' 
জামাল সাহেবের এসব কথা শুনে জহিরের আর বুঝতে বাকি রইলো না কাজটা কে করেছে। কেন করেছে।

Friday, December 25, 2015

বিদেশে ভিক্ষা

রফিকুল ইসলাম সাগর
আমাদের দেশে ভিক্ষুকরা হাত পেতে নির্লজ্জের মতো ভিক্ষা করে। কিন্তু বাইরের দেশগুলোতে ভিক্ষুকরা ভিক্ষা করে নানাভাবে তাদের প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যমে পরিশ্রম করে। এতে মানুষ বিনোদন পায়, খুশি হয়ে তাদের টাকা দেয়। প্রথম যেদিন কুয়ালালামপুর গিয়েছিলাম, শহরের বুকিট বিনতাং নামক এলাকার ব্যস্ততম রাস্তায় এ রকম দৃশ্য দেখে অবাক হয়েছিলাম।

দেখতে পেলাম একটি স্থানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেছে। সেখানে ক'জন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। যে সুর আমার কানে ভেসে আসছিল, যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, তাদের ঘিরেই মানুষগুলোর ভিড়। সেখান থেকে আমি মোটামুটি দূরেই ছিলাম। বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তাদের সৃষ্টি করা অসাধারণ সুর প্রথমে আমার কানে ভেসে আসে। এমন অসাধারণ সুর যা যে কাউকেই আকর্ষণ করবে। আমাকেও আকর্ষণ করল। আশপাশে তাকিয়ে যখন বুঝতে পারলাম সুরটা কোথা থেকে আসছে তখন এগিয়ে যাওয়ার সময় ভাবলাম, সম্ভবত মালয়েশিয়ান কোনো সেলিব্রেটি শিল্পীর কনসার্ট হচ্ছে। একেবারে কাছাকাছি গিয়ে যখন অন্য দর্শনার্থীদের সঙ্গে দাঁড়ালাম, তখন যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে তাদের সবাইকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। পাঁচ-ছয়জনের একটি দল। এদের মধ্যে একজন বাঁশি বাজাচ্ছে, একজন মাউথওর্গান বাজাচ্ছে, একজন বেহালা, একজন গিটার বাজাচ্ছে। খেয়াল করলাম এদের সবাই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। কারও পা নেই, হুইল চেয়ারে বসে বাজাচ্ছে। আবার কেউ অন্ধ। মনে মনে এদের সবাইকে স্যালুট জানিয়েছিলাম। কী দারুণ প্রতিভা তাদের। যারা সরাসরি দেখেননি তাদের বোঝানো আমার পক্ষে কষ্টকর। একজন হুইল চেয়ারে বসে ঘুরে ঘুরে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলছে। যার ইচ্ছা টাকা দিচ্ছে, কেউ আবার দিচ্ছে না। কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। পরে জানতে পারলাম, এটি মালয়েশিয়ায় ভিক্ষা করার পদ্ধতি। এখানে এত সহজে ভিক্ষা মেলে না। ভিক্ষুকরা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও নানা প্রতিভা প্রকাশ করে ভিক্ষা নেয়। কোনো কোনো ভিক্ষুক টিস্যু বিক্রি করে। কোনো ভিক্ষুক নিজ হস্তে বানানো জিনিসপত্র বিক্রি করে। এ ধরনের ভিক্ষুকদের কাছ থেকে যারা জিনিসপত্র কেনেন তারা জিনিসের প্রকৃত মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি দয়া হলে অতিরিক্ত টাকা দান করেন। 
পুডু নামক একটি স্থানে প্রায়ই আমার চলাচল ছিল। সেখান থেকে আম্পাং নামক স্থানে (আম্পাং এলাকায় আমি থাকতাম) ফেরার সময় রেলস্টেশনে প্রবেশের রাস্তায় সবসময় দু'জন ভিক্ষুককে দেখতে পেতাম। দু'জনেই অন্ধ। বুড়াবুড়ি স্বামী-স্ত্রী। সবসময় দেখতাম তারা খালি গলায় কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান গায়। দুটি ছোট ছোট সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে দূর থেকেও তাদের গান শুনতে পাওয়া যেত। যদিও গানের গলা খুব বাজে ছিল। শুনতে কেমন জানি লাগত। তবে বুড়াবুড়ি দু'জনকে দেখলে খুব মায়া হতো। কারও বয়স ৭০ বছরের নিচে হবে না। বয়সের ভারে দু'জনই নুইয়ে পড়েছেন। শরীরের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। বুড়ার দাঁত প্রায় সবই পড়ে গেছে। এই বুড়াবুড়ির চেহারা প্রায়ই আমার চোখে ভেসে ওঠে। বুড়িকে দেখতাম বসে বুড়ার কাঁধে একহাত রেখে মাথা নিচু করে গান গাইত। বুড়ার পরনে থাকত মালয়েশিয়ান পাঞ্জাবি (স্থানীয় নাম 'বাজুরায়া'), মাথায় টুপি। দু'জনের চোখে কালো চশমা।

নিজেকে রক্ষার কৌশল জানে মেসি

রফিকুল ইসলাম সাগর 


আর্জেন্টিনার সুপারস্টার লিওনেল মেসি। ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় মেসি যিনি টানা চারটি ফিফা / বালোঁ দ’অর পুরস্কার জিতেছেন। এছাড়া প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি তিনটি ইউরোপীয়ান গোল্ডেন শু পুরস্কারও জিতেছেন। অনেক ভাষ্যকার, কোচ এবং খেলোয়াড় তাকে বর্তমান সময়ের সেরা এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে দাবী করে থাকেন। এছাড়া অনেকে তাকে ফুটবলের জাদুকরও বলে থাকেন। মাঠে মেসির অবাক করা খেলা দেখলে মনে হয় সত্যিই তিনি জাদু জানেন। বল পাস দেওয়া, গোল পোস্টের দিকে বল কিক করা, বল নিয়ে আক্রমন সহ সব মিলিয়ে মেসির খেলায় চমত্কার সব কৌশল যা খেলা দেখার মুহুর্তে যে কাউকেই আকর্ষণ করে

এবারের বিশ্বকাপে দুই যুগ পর আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে। এ বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত প্রতিটি খেলায় আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে। মেসি একাই গোল করেছেন চারটি। পাশাপাশি প্রতিটি খেলায় আর্জেন্টিনা গোল পেয়েছে মেসির অবদানে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের সাথে খেলার শেষ মুহুর্তে মেসির দুর্দান্ত পাসে ডি মারিয়া গোল করে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন। এবার আর্জেন্টিনার খেলায় শেষ মুহুর্তে মেসি অবাক করার মতো চমক দেখিয়েছে। তিন চারজন খেলোয়াড় একসাথে যখন মেসির পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তখন মেসিকেও দেখা গিয়েছে কৌশলে সব বাধা অতিক্রম করে, প্রতিপক্ষের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বল নিয়ে এগিয়ে যেতে। এমন আকর্ষনীয় খেলা দেখে যে কাউকেই বলতে হয়, এটা কি করে সম্ভব। কাউকে কাউকে ভাবতে বাধ্য করে, মেসি কি জাদু দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গেল! কিন্তু না জাদু না এটাই মেসির খেলা। অনুশীলনে মেসি ফুটবলকেও পোষ মানিয়ে নিয়েছেন তার খেলা এমনটাই প্রমান করে। এছাড়া এতে কোনো সন্দেহ নেই যে- মেসি সৃষ্টিকর্তার এক ভিন্ন সৃষ্টি। 


আমি মনে করি, ফাউল না করে খেলা একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড়ের গুনাবলী। মেসির মধ্যে সেই গুন আছে


মেসির খেলায় যে ব্যাপারটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে তা হলো, একজন খেলোয়াড় যখন পা থেকে বল কেড়ে নিতে ফাউলের চেষ্টা করে তখন মেসি কৌশলে নিজেকে রক্ষা করে নেয়। খেলার মাঠে নিজেকে রক্ষার সব কৌশল জানে মেসি। 


আগামী খেলা সেমিফাইনালে হল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। খেলার ফলফল- আর্জেন্টিনার জয় কামনা করি। কিন্তু দুর্বল ডিফেন্স নিয়ে বর্তমান হল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে জয় পাওয়া কঠিন। তবে মেসি চমক আবারো জয়ের পথ দেখতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আশা জাগায়। মেসিদের জন্য শুভ কামনা।

মানুষ মানুষের জন্য

রফিকুল ইসলাম সাগর
‘মানুষ মানুষের জন্য’ এটা শুধু কথায়। কিন্তু কাজেও তা প্রমাণ করতে হবে। আমরা আর কিছু না পারলেও একজন আরেকজনকে খুব ভালোভাবে জ্ঞান দিতে জানি। পাশের বাড়ির মানুষটি যদি কোনো বিপদে পড়ে তাহলে আমরা তাকে অনেক বড় বড় কথা বলি কিন্তু সমাধান কেউই করি না। আমাদের নিকট আত্মীয় যদি না খেয়ে থাকে আমরা তাকে জ্ঞানের কথা বলি; কখনো তার বাসায় চাল-ডাল নিয়ে যাই না। নিজ থেকে আমরা জামেলায় জড়াতে চাই না। নিজের মানিব্যাগ ফুলানোই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। তবে কেন এত বড় কথা ‘মানুষ মানুষের জন্য’? একজন যদি অপরজনের বিপদে এগিয়ে আসত তাহলে কোনো মানুষ সহজে বিপদে নিপতিত হয়ে থাকতে হতো না। কেউ না খেয়ে থাকত না। আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে, আমরা একজন আরেকজনের ভালো দেখতে পারি না। একটা মানুষ যখন ভালো কিছু করে তখন আমাদের মধ্যে হিংসা কাজ করে। তাই কেউই কিছু করতে পারি না। এ স্বভাব পরিবর্তন করতে হবে। সবারই উচিত একজনের সমস্যায় জ্ঞান না না দিয়ে সঠিক সমাধানের উপায় বের করে দেয়া। 

সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত 

Wednesday, October 14, 2015

স্কুল জীবনের স্মৃতি

রফিকুল ইসলাম সাগর

ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্লাসের ইংলিশ স্যার (সুব্রত বড়ুয়া) ক্লাস চলাকালীন সময় প্রায়ই আমাদের উপর রেগে গিয়ে যে কথাগুলো বলতেন তা হলো, ‘এখন তোদের চোখে রঙিন চশমা তাই সব কিছুই রঙিন লাগে। সব কিছুই সুন্দর লাগে। একদিন চোখের এই রঙিন চশমা খুলে যাবে। সব রঙিন স্বপ্ন সাদাকালো হয়ে যাবে।’ কথাগুলো তিনি বলতেন যখন আমরা পড়া পারতাম না। পড়া লেখা না করলে সব রঙিন স্বপ্নই সাদাকালো হয়ে যাবে তিনি তাই আমাদের বুঝাতেন।
তিনি বলতেন, ‘তোদের এখন যে বয়স এটা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। একদিন এই দিনের জন্য আফসোস করবি। তোদের বাবা-মা কত কষ্ট করে তোদের লেখাপড়া করতে পাঠায়। হেলাফেলায় সময় নষ্ট করিস না।’ স্যারের সেই কথাগুলো খুব মনে পড়ে। বছর চারেক আগে আমাদের সেই স্যার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সেদিন আমরা স্কুলের অনেক বন্ধু স্কুলে গিয়েছিলাম। স্মৃতিচারণ করেছিলাম স্কুল জীবনের অনেক কথা।
আমি প্রচুর স্কুল ফাকি দিতাম। স্কুলে গেলে সব সময় বসতাম লাস্ট বেঞ্চে। পরীক্ষায় পাস করতাম কোনো রকমে টেনেটুনে। যখন রেজাল্ট কার্ড পেতাম সেটা বাড়িতে দেখানো নিয়ে করতাম নানা তালবাহানা। কাউকে না দেখিয়েই স্কুলে জমা দিয়ে দিতাম। আম্মার স্বাক্ষর নকল করতাম। নিজেই রেজাল্ট কার্ডে স্বাক্ষর করে দিতাম। কত মধুর ছিল সেই স্মৃতিগুলো।
আমাদের স্কুলের আরেক শিক্ষক বিজয় কৃষ্ণ মুন্সী স্যার। তিনি ছিলেন ক্লাস এইটে আমাদের শ্রেণী শিক্ষক (অংক)। তার সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। অনেক ছাত্রেরই প্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন অংকে স্কুলের সেরা শিক্ষক। আমি তার বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তাম। স্যার কেন জানি ‘মামা’ শব্দটাকে খুব অপছন্দ করতেন। মামা শব্দটা শুনলে খুব খেপতেন। আর তাই স্কুলে, রাস্তায় অনেক ছাত্ররাই স্যারকে মামা বলে খেপাত। পেছন থেকে ‘ওই মামা’ বলে ছাত্ররা লুকিয়ে পরত। স্যার তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেত না। আবার অনেক সময় কেউ কেউ স্যারের কাছে ধরা পড়েও যেত। যে ধরা পরত তার উত্তম-মাধ্যম খাওয়া তো মিস ছিল না। একদিন আমি স্যারের সাথে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছি। তখন একটা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে শব্দ শোনা গেল মামা... ওই মামা... মামা....। স্যারের সাথে আমিও উপরের দিকে তাকিয়ে চেহারা স্পষ্ট দেখার আগেই দেখলাম দু’জন লুকিয়ে পড়েছে। স্যার আমাকে বললেন, চিনতে পেরেছিস? আমি বললাম, না স্যার। আবার দু’জন হাঁটা শুরু করি। ওরা আবার শুরু করল, ওই মামা... মামা...। আমার তো হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হওয়ার দশা কিন্তু জোর করে হাসি চেপে রাখলাম নয়তো সে মুহূর্তে ওদের রাগ স্যার আমার ওপরই মেটাতেন।
আরেক দিন সকালের ঘটনা। আমি আর স্যার একটি হোটেলে নাস্তা খেতে বসেছি। হোটেলের ওয়েটাররা তো সবাইকে সাধারণত মামা বলেই ডাকে। তো ওয়েটার বলল, মামা কী খাইবেন? সাথে সাথে স্যার উঠে দাঁড়ালেন। আর ওয়েটারের গালে কশিয়ে চর বসিয়ে দিয়ে বললেন, আমাকে মামা বললি কেন? সেই মুহূর্তে আমি স্যারকে থামিয়ে দিয়ে তার গরম মাথা ঠাণ্ডা করলাম। তারপর থেকে সেই ওয়েটারও রাস্তায় স্যারকে দেখলে মামা বলে পালিয়ে যেত। এমন অসংখ্য খণ্ড খণ্ড স্মৃতি প্রায়ই হাসায়, ভাবায়, কাদায়।

Saturday, October 10, 2015

বাংলার অজপাড়া এক গাঁয়ে

রফিকুল ইসলাম সাগর



সকাল সোয়া দশটা। মহাখালী বাস টার্মিনাল এসে দশ মিনিটের জন্য বাস মিস করলাম। মাসুল গুণতে হল দেড় ঘন্টা। পরের বাস বেলা সাড়ে এগারটায়। ততক্ষণ টার্মিনালের ভেতরেই অপেক্ষা। সময় কাটল খুবই অস্থিরতায়। এর মধ্যে কতবার যে ওয়েটিং রুমের সিট থেকে উঠে বাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়েছি তার হিসেব নেই। এগারটা বেজে কুড়ি মিনিট। একজন এসে বলল, 'সিলেট এগারটা ত্রিশের যাত্রীরা আমার সাথে আসেন'। ওঠার পর ঠিক সময়েই বাস ছাড়ল অবশ্য।
ভৈরব পর্যন্ত যানজটবিহীন আরামেই যাচ্ছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামের কারণে ভৈরব দূর্জয় মোড় থেকে ব্রিজ পার করতে দশ মিনিটের পথ প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগে গেল। এবার বি-বাড়িয়া বিশ্বরোড পৌঁছলে বাস থেকে নেমে চার'শ টাকায় ভাড়া করা সিএনজি অটোরিক্সায় উঠলাম। আগামী গন্তব্য ফান্দাউক। প্রায় দশ মিনিটের পথ এগিয়ে সড়কের পাশেই বাঁদিকে একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প চোখে পড়ল। অটোরিক্সা চালক জানালেন, এটা বাংলাদেশের ছ'টি বড় বিজিবি ক্যাম্পের একটি। 
দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা অটো সরাইল পেরিয়ে যাওয়ার সময় সড়কের দু'পাশে দেখতে পেলাম দূরদূরান্ত পর্যন্ত পানি আর পানি। থৈ থৈ পানির বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ট্রলার আর নৌকা। ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছে। আশেপাশে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ল না। প্রচণ্ড বাতাস। যাকে বলে প্রাণ জুড়োনো বাতাস। অটোরিক্সার প্লাস্টিকের বডিতে বাতাসের আঘাত করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মুখটা একটু বাইরে বার করে বাতাসের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করলাম। আহ! এসব অনুভূতির জন্যই মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় - কথাগুলো মনে এল। ততক্ষণে ফান্দাউক পৌঁছে গেছি। ভাড়া মিটিয়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। খানিক এগোতে সামনেই বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পেরিয়ে আবার তার জন্য টোল পরিশোধ করতে হল জনপ্রতি পাঁচ টাকা! সাঁকোটির হাল দেখে মনে হল, টোলের টাকা সাঁকোটি মেরামতের কাজে ব্যবহার হয় না। এখানে টোল আদায় শুধুমাত্র ধান্দাবাজি। এ ব্যবসা অবশ্য আর বেশিদিন চলবেনা - পাশেই দেখতে পেলাম সেতু নির্মাণের কাজ অর্ধেকেরও বেশি হয়ে গেছে। শেষ হলে এই পথে সরাসরি বাস চলবে।
বিখ্যাত ফান্দাউক বাজারের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নজর পড়ল একটা মিষ্টির দোকানের ভিতরে। রসমালাই দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। বেশ ভিড়। ভেতরে বসার জায়গা পেলাম না। দাঁড়িয়েই একবাটি রস মালাই খেয়ে আরো দু কেজি প্যাকেটে দিতে বললাম। ঢাকার থেকে ঢের সস্তা। আরো দু'কেজি অন্য মিষ্টিও কিনে নিলাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটে এবার ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সায় বামৈ পর্যন্ত গেলাম। পঁচিশ মিনিটের মতো সময় লাগল। এখনও অবশ্য কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাইনি।
সকাল সোয়া দশটা। মহাখালী বাস টার্মিনাল এসে দশ মিনিটের জন্য বাস মিস করলাম। মাসুল গুণতে হল দেড় ঘন্টা। পরের বাস বেলা সাড়ে এগারটায়। ততক্ষণ টার্মিনালের ভেতরেই অপেক্ষা। সময় কাটল খুবই অস্থিরতায়। এর মধ্যে কতবার যে ওয়েটিং রুমের সিট থেকে উঠে বাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়েছি তার হিসেব নেই। এগারটা বেজে কুড়ি মিনিট। একজন এসে বলল, 'সিলেট এগারটা ত্রিশের যাত্রীরা আমার সাথে আসেন'। ওঠার পর ঠিক সময়েই বাস ছাড়ল অবশ্য।
ভৈরব পর্যন্ত যানজটবিহীন আরামেই যাচ্ছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামের কারণে ভৈরব দূর্জয় মোড় থেকে ব্রিজ পার করতে দশ মিনিটের পথ প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগে গেল। এবার বি-বাড়িয়া বিশ্বরোড পৌঁছলে বাস থেকে নেমে চার'শ টাকায় ভাড়া করা সিএনজি অটোরিক্সায় উঠলাম। আগামী গন্তব্য ফান্দাউক। প্রায় দশ মিনিটের পথ এগিয়ে সড়কের পাশেই বাঁদিকে একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প চোখে পড়ল। অটোরিক্সা চালক জানালেন, এটা বাংলাদেশের ছ'টি বড় বিজিবি ক্যাম্পের একটি। 
দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা অটো সরাইল পেরিয়ে যাওয়ার সময় সড়কের দু'পাশে দেখতে পেলাম দূরদূরান্ত পর্যন্ত পানি আর পানি। থৈ থৈ পানির বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ট্রলার আর নৌকা। ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছে। আশেপাশে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ল না। প্রচণ্ড বাতাস। যাকে বলে প্রাণ জুড়োনো বাতাস। অটোরিক্সার প্লাস্টিকের বডিতে বাতাসের আঘাত করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মুখটা একটু বাইরে বার করে বাতাসের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করলাম। আহ! এসব অনুভূতির জন্যই মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় - কথাগুলো মনে এল। ততক্ষণে ফান্দাউক পৌঁছে গেছি। ভাড়া মিটিয়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। খানিক এগোতে সামনেই বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পেরিয়ে আবার তার জন্য টোল পরিশোধ করতে হল জনপ্রতি পাঁচ টাকা! সাঁকোটির হাল দেখে মনে হল, টোলের টাকা সাঁকোটি মেরামতের কাজে ব্যবহার হয় না। এখানে টোল আদায় শুধুমাত্র ধান্দাবাজি ব্যবসা। এ ব্যবসা অবশ্য আর বেশিদিন চলবেনা - পাশেই দেখতে পেলাম সেতু নির্মাণের কাজ অর্ধেকেরও বেশি হয়ে গেছে। শেষ হলে এই পথে সরাসরি বাস চলবে।
বিখ্যাত ফান্দাউক বাজারের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নজর পড়ল একটা মিষ্টির দোকানের ভিতরে। রসমালাই দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। বেশ ভিড়। ভেতরে বসার জায়গা পেলাম না। দাঁড়িয়েই একবাটি রস মালাই খেয়ে আরো দু কেজি প্যাকেটে দিতে বললাম। ঢাকার থেকে ঢের সস্তা। আরো দু'কেজি অন্য মিষ্টিও কিনে নিলাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটে এবার ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সায় বামৈ পর্যন্ত গেলাম। পঁচিশ মিনিটের মতো সময় লাগল। এখনও অবশ্য কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাইনি।

"বাকিটা পথ যেতে হবে 'বামৈ নাউ ঘাট' থেকে ইঞ্জিন চালিত কাঠের নৌকায় চড়ে (নৌকার স্থানীয় নাম 'নাউ')। ঘাটে পাঁচ-ছ'টি নৌকা দেখতে পেলাম। দেখতে প্রায় একই রকমের সবকটা। আকারে খুব বড় না। ঘরের মতো চারদিক বন্ধ। ওপরে টিনের চাল। সামনে পিছনে দরজার মতো ফাঁকা দুটি প্রবেশ পথ। দু'পাশে তিন-চারটি জানালা। শিশু ও মহিলারা বসেছে ঘরের ভিতর। পুরুষরা টিনের চালের ওপর। অন্যদের মতো আমিও বসলাম চালের ওপরেই। একে একে সংখ্যায় আমার ধারণার বেশি যাত্রী উঠলো। তারপরেও মাঝি আরও যাত্রী নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। মাঝির সঙ্গে নৌকার হেলপার একটি শিশু। শিশুটি একটু পরপর উচ্চস্বরে ডাকছে, 'জিরু ন ন ন ন ন ন ন্ডা'। নৌকোটা টলমল করতে দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম, যদি ডুবে যায় এই ভেবে। আর তখনই নৌকার মাঝি যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, 'নাউ গড়াইতাছে! সামনে পিছে মিল্লা বও'। আরো ক'জন যাত্রী উঠল নৌকায়। অতঃপর ঘাট থেকে একজন নাউ ছাড়ার নির্দেশ দিল। ইঞ্জিন স্টার্ট করে নাউ নিয়ে এগিয়ে চলল মাঝি। অধিক যাত্রীর ভারে নৌকা প্রায় ডোবে-ডোবে অবস্থা। আমার মনে আতঙ্ক! এমনভাবে যাতায়াত করা এখানের মানুষের কাছে হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু আমি ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছিলাম না। 
বেলা প্রায় শেষের দিকে। পশ্চিমের আকাশের একাংশে একটু আগুনের রঙের মতো লালচে দাগ। কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতার মাঝে ব্যাঙের ডাক আর নৌকার ইঞ্জিন ঘোরার শব্দ। এর সঙ্গে সূর্যটা যেন ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেমন জানি ঝিম-ম-ম অনুভূতির মাঝে হারালাম। সমস্ত শরীরে বাতাসের আঘাত গোটা দিনের সব ক্লান্তি তাড়িয়ে দিচ্ছিল। আলো তখনও পুরোপুরি অন্ধকারে হারায়নি। বিদ্যুতের ভোল্টেজ একেবারেই কম থাকলে একটা বাল্বের আলো যেমন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায় ঠিক তেমনি সূর্যের আলোর নিভু নিভু ভাব। হঠাৎ সূর্যটা হারিয়ে গিয়ে চারিদিকে অন্ধকার নামিয়ে গেল। প্রতিদিন ঠিক একইভাবে সূর্য আসা-যাওয়া করে। পার্থক্য শুধু আগেরদিন সূর্যডুবির এ দৃশ্য দেখেছিলাম ঢাকার আকাশে। ঘড়ির কাঁটা সেকেন্ড তারপর মিনিট এভাবে এগোচ্ছে। এরই মাঝে সেই শিশুটি এসে ভাড়া চাইল, মাথাপিছু দশ টাকা। ততক্ষণে 'জিরুন্ডা' গ্রামের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছি, আর হয়তো মিনিট দশ।

নৌকায় থাকা যাত্রীদের প্রস্তুতি দেখে বুঝতে বাকি রইল না, জিরুন্ডা এসে গেছি। আধঘন্টা কেটে গেছে এরমধ্যেই। ঘাটে পৌঁছাবার আগেই ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন মাঝি। চিকন মাপের বাঁশ হাতে নিয়ে এবার তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বাঁশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে নৌকা ঘাটে ভেড়ালেন। ভেবেছিলাম এখানেই নামতে হবে। মাহমুদ ভাই বললেন, এ ঘাটে নামব না। একজন মহিলা ও শিশুকে নামিয়ে আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন মাঝি। দু'মিনিট পর একইভাবে আরেক ঘাটে ভেড়ানো হলো নৌকা। এখানেও নামল ক'জন। এভাবে চারটি ঘাট পর অবশেষে পৌঁছলাম জিরুন্ডা গ্রামে। লোকাল বাসে চড়েছি, লোকাল ট্রেনে চড়েছি, জীবনে এই প্রথম লোকাল নৌকায় চড়লাম। ঘাটে ঘাটে যাত্রী নামানো দেখার অভিজ্ঞতা প্রথম বলে হয়তো দারুণ মনে হল। যেই নৌকাটিতে করে এখানে এলাম এটি নাকি ছিল এ পথের লাস্ট ট্রিপ। সকাল পর্যন্ত আর কোনও নৌকা চলবে না। কোনও কারণবশত যদি কেউ বামৈ থেকে রওনা দিতে দেরি হয়ে যায় তাহলে জিরুন্ডা ফিরতে তার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রাতে ডাকাতির সম্ভাবনা আছে বলে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে। রাতযাপন করলাম এক নিকট আত্বীয়ের বাড়িতে - পনেরদিন আগেও নাকি এটি পুরোপুরি পানিবন্দী ছিল। রাত পেরিয়ে সকাল বেলা গ্রামের পুরোপুরি রূপ ধরা দেয় আমার দৃষ্টিতে। যে রূপ রাতের আঁধারে ছিল অস্পষ্ট। আশপাশ ঘুরে দেখলাম এখনো অনেক বাড়ি পানির মাঝে উঁকি দিয়ে আছে। 
জিরুন্ডা গ্রামের নাম অনেক পাঠকই সম্ভবত এর আগে কোনদিন শোনেননি। আমি এ গ্রামের নাম প্রথম শুনি বছর তিনেক আগে। সেই তখন একবার এসেছিলাম, মাঝে পাঁচ-ছয় মাস আগে আরেকবার। জিরুন্ডা নামক গ্রামটি হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত, লাখাই থানার অন্তর্ভুক্ত। জিরুন্ডা এবং তার আশেপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম - মানপুর, সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাধানগর – এদের অজপাড়াগাঁ বলা চলে। গ্রামগুলোর বছরে দুই রূপ - জুলাই থেকে অক্টোবর বর্ষাকালীন একরূপ, আর বাকি মাসগুলোতে আবার অন্য রূপ। পূর্বে দু'বার যখন এসেছিলাম অনেকেই আমাকে বর্ষাকালে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বর্ষাকালে নৌকা একেবারে ঘরের দরজার সামনে আসবে, এমন কথা বলেছিল কেউ কেউ। সব মিলিয়ে এবার আমন্ত্রণে সাড়া দিতে পেরেছিলাম। বামৈ থেকে যখন নৌকায় উঠলাম তখন আগের দেখা অনেক কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। না পারাটাই স্বাভাবিক। জোয়ারের পানিতে পথ-ঘাট, মাঠ, ধানের ফসল, খাল-বিল, ঝিল সব মিলে মিশে একাকার। নৌকায় কয়েকজন জানায়, এখন তবু জোয়ারের পানি নামতে শুরু করেছে। এবারের বন্যায় নাকি গত কয়েক বছরের তুলনায় দ্বিগুণের চেয়েও দ্বিগুণ পানিতে ডুবেছিল। কিছু কিছু জায়গায় এখন পানি না থাকলেও, কিছুদিন আগেও নাকি পানিতে ডুবে ছিল, এমন কথাই বলাবলি করছিলেন গ্রামের ক'জন প্রবীণ।
জিরুন্ডাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষরা যোগাযোগসহ আধুনিক অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছুই প্রায় পাওয়া যায় না গ্রামে। বাজার আনতে যেতে হয় বামৈ নয়তো ফান্দাউক। সদরে বা রাজধানীতে যেতে হলে আগে যেতে হবে বামৈ। সেখান থেকে রাজধানী যাওয়ার বাস ছাড়ে দিনে দু'টি। তাও আবার লক্কর-ঝক্কর লোকাল বাস। গ্রামে পথচলার রাস্তা যতটুকু আছে তা না-থাকার মতোই। রিক্সায় চড়ে কিছুটা পথ যাওয়া গেলেও বেশ কয়েকবার যাত্রীকে নেমে হেঁটে সামনে গিয়ে আবার উঠতে হয়। হিসেব কষলে দেখা যায়, রিক্সায় বসে থাকার চেয়ে হেঁটেই বেশি পথ আসা হয়েছে। আর তাই দূরত্বের ব্যবধানটা অনেক বেশি হলেও, দীর্ঘ সময় লাগলেও প্রয়োজনে গ্রামের মানুষেরা পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করেন। গোটা কয়েক গ্রাম মিলিয়ে রিক্সার সংখ্যা হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা। বরং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকলেও সব মিলিয়ে এখানকার মানুষজনের বর্ষাকালেই চলাচলে সুবিধা – নৌকাতে – যখন খাল-বিল-পথ-মাঠ-ক্ষেত সব মিলেমিশে একাকার।

ঘড়ির কাঁটায় বেলা এগারটা। জিরুন্ডা গাঁয়ের নাউ ঘাটে বসে নৌকায় ওঠার জন্য অপেক্ষা। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর কিনতে বামৈ যেতে হবে। পনের মিনিট অপেক্ষা করে নৌকা পেলাম। গতরাতের মতো চালের ওপর উঠে বসলাম। রোদের তাপ একটু বেশিই মনে হল। পাশাপাশি একের পর এক ঘাট থেকে নৌকায় যাত্রী উঠছে। এই ঘুরপাকে কেটে গেল আধ ঘন্টার বেশি সময়। অথচ আধ কিলোমিটার পথও এগোতে পারিনি। এক পর্যায়ে খুব বিরক্ত লাগছিল। রোদের তাপ আরো বেশি মনে হচ্ছিল। কয়েকজন রোদ থেকে নিজেকে আড়াল করতে ছাতা মেলে ধরেছে মাথার ওপর। তাদেরকে এমন ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখে নিজেকে বড় অসহায় মনে হল। দেখলাম, বুড়ো মাঝিটাও একটা ছাতা মেলল। আমাকে ডাকল, তার পাশে আসার জন্য। আমার হাতে ছাতাটি ধরিয়ে দিয়ে তিনি ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন - তারপর আমার পাশে বসলেন। থৈ থৈ পানির বুকে ভাসছে নৌকা। মাঝি একটা লোহার হ্যান্ডেলের মাধ্যমে নৌকাটিকে ডানে-বায়ে নিয়ন্ত্রণ করছে - আমি আমাদের দুজনের মাথায় ছাতা ধরে! বুড়ো মাঝি একটু পরপর একটা করে বিড়ি জ্বালিয়ে ফুঁকছে। কিছু বলতে পারলাম না, রোদে পোড়ার চেয়ে বিড়ির ধোঁয়া বেশি উত্তম বলে তখন মনে হল।
জোয়ারের পানিতে গ্রামের মানুষের মাছ ধরার দৃশ্য আমার কাছে এক প্রকারের উত্সবের মত লাগে যাকে বলা যেতে পারে সিজনাল মাছ ধরার উত্সব। নৌকায় বসে দেখলাম এখানে-সেখানে অনেকেই সিটকি জাল পেতে বসেছে। আবার কেউ কেউ উড়াইন্যা জাল ব্যবহারে মাছ ধরছে। এছাড়া নৌকা থেকে জাল ফেলে ও বর্শি পেতেও মাছ ধরতে অনেকে ব্যস্ত। দেখে মনে হল, মাছের চেয়ে মাছ ধরার মানুষের সংখ্যা বেশি। বামৈ ঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগবে আর দু'তিন মিনিট। এ পথে অনেকগুলো মাছ ধরার জাল পাতা। আর তাই মাঝি খুব সতর্কভাবে নৌকা এগিয়ে নিচ্ছিল। ইঞ্জিন বন্ধ করে মাঝি এবার বাঁশ হাতে নিল। নৌকার ইঞ্জিনের পাখায় জাল আটকে গেলে ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নৌকা থেকে নেমে ঘাটে গতদিনের তুলনায় মানুষের আনাগোনা একেবারেই দেখলাম না।
আধঘন্টা পর আবার ঘাটে এসে সেই নৌকাটিতেই উঠলাম জিরুন্ডা যাওয়ার জন্য। যাত্রী সংখ্যা কম থাকলেও মাঝি আমাদের নিয়ে নৌকা ছাড়ল। একটু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর একজন মহিলা যাত্রী মাঝিকে ভেতর থেকে বলল, নৌকা ঘাটে ভেড়াতে। এ ঘাট থেকে তার লোক উঠবে। নৌকা ঘাটে ভিড়লে মহিলাটি জোরে চিত্কার করল, আফা - আফা (আপা) বলে। চিত্কারে পাশেই একটি বাড়ি থেকে শিশু-কোলে বয়স্ক একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। তাঁর কথায় বোঝা যাচ্ছিল, তিনি এখন যাবেন না, পরে আসবেন। আমাদের সবাইকে নৌকায় অপেক্ষা করিয়ে দুই বোনের আলোচনা চলছে..। আমার খুব বিরক্তি লাগছিল। মাঝির মুখের দিক তাকিয়ে বুঝলাম উনিও বিরক্ত। তাদের দীর্ঘ আলাপচারি ফুরোলে নৌকা ছাড়ল। যাত্রী কম হলেও নামানোর সময় এক-এক ঘাটে এক-একজন করে নামছে। গতদিন যাত্রী বেশি থাকলেও এতগুলো স্টপেজ দেয়নি। আমি যে ঘাটে নামব সেটি এল একেবারে শেষে। নেমে কোমর টনটন করছে দেখে শরীরটা একটু নাড়াচাড়া করে নিলাম। 

জিরুন্ডা ফিরে দুপুরের খাওয়া শেষে বেড়াতে বেরোলাম। কাঁচা মাটির পথে হেঁটে যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম আমার দিকে গ্রামের মানুষগুলোর কেমন জানি ভিন্ন দৃষ্টি। যেন বড় মাপের কোনো তারকা! মহিলারা বাড়ির উঠোনে আমাকে দেখতে ভিড় করেছে। লজ্জায় মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে উঁকি দিয়ে দেখছে। যেদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, সবাই আমাকে নিয়েই যেন কথা বলাবলি করছিল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর এমন কাণ্ডে এক পর্যায়ে নিজেও লজ্জা পেতে শুরু করল। কয়েকপা এগিয়ে একসঙ্গে অসংখ্য গজারী গাছ দেখতে পেলাম। সেখান থেকে ভেসে আসছে পাখিদের জোরালো কিচির-মিচির। সামনে এগিয়ে দেখি গাছগুলোর ডালে ডালে দলে দলে চড়ুই পাখির ঝাঁক। মনে হল গোটা গাঁয়ের সব চড়ুই পাখি যেন এখানে জোট বেঁধেছে। কিচির-মিচির শব্দে কান ঝালাপালা করা অবস্থা। এরপর হাঁটতে হাঁটতে যেখানে গিয়ে থামলাম জোয়ারের পানি পথ ছুঁই-ছুঁই। আরেকটু সামনে কদম ফেললে আমার পা ভিজে যায় পানিতে। তাকিয়ে দেখি, কচুরীপানার ভেলা ভেসে যাচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা-বক মাছ খুঁজছে, আবার কোনটি মাছ পেয়ে উড়াল দিয়ে চম্পট হচ্ছে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য মন ভালো করে দেয় নিমেষেই। এসব কিছুর মাঝেই কাটালাম পাঁচদিন। 
গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোকে ছেড়ে ব্যস্ত শহরে যখন ফিরব বিদায়বেলায় নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল এসেছিল।