Showing posts with label ভ্রমন. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমন. Show all posts

Thursday, September 8, 2016

পাগলের মেলায়


“ভ্রমণ তো বানিয়ে তোলা গল্পকথা নয়, মানুষের সত্যিকারের জীবনকাহিনি। আর তাই ভ্রমণ কাহিনি মনে শুধু আনন্দই এনে দেয় না, চোখের জল অথবা প্রতিবাদের ভাষাও জাগিয়ে দিতে পারে। ট্যুরিজম ইন্ড্রাস্ট্রির সহায়ক বিজ্ঞাপনী প্রচারমাধ্যম ছাড়াও ভ্রমণ কাহিনির বড় পরিচয় বিশ্ব সাহিত্যের একটি অন্যতম ধারা রূপেও। তেমনই কিছু 'অন্য ভ্রমণ' কথা।”  Read more about :: Amader Chhuti ::


রফিকুল ইসলাম সাগর

কখনও কখনও কোনও রকমের পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই বেরিয়ে পড়ি,শহর ছাড়িয়ে অচিন কোনও গাঁয়ের পথে। এইতো কিছুদিন আগের কথা,ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত এগারটা ছুঁইছুঁই। ঘরে ফিরব ফিরব করছিলাম। তখনই বন্ধু শাকিল জানাল,প্রাইভেট কার নিয়ে ভোরবেলা মতলব যাবে। সঙ্গে যাবে জাহাঙ্গীর ভাই। আমাকেও যাওয়ার জন্য খুব জোর করল। যাব না বললাম প্রথমে। কিন্তু তারপরই মন দেখি যাই যাই করছে। যাব কি যাব না পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। বললাম,বাসায় গিয়ে ঠিক করি,তারপর জানাচ্ছি। ঘরে ফিরেই ঠিক করলাম ঘুরেই আসি। বন্ধুকে যাচ্ছি বলে জানিয়ে দেওয়ায় খুব খুশিও হল। খুব ভোর বেলা মোবাইলটা বেজে উঠল। ডাক পড়ল। বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর পাঁচটা প্রায়। ঘন্টাখানেক পর ভাড়া করা গাড়িতে শাকিল আর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে রওনা দিলাম। রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা। শহরের ঘুম ভাঙার আগেই আমরা পেরিয়ে গেলাম। মহাখালী থেকে রওনা হওয়ার সময়ই জাহাঙ্গীর ভাই নাস্তা খাওয়ার কথা বলেছিল। পরে গাড়িতে বসে কথায় কথায় কাচপুর ব্রিজ চলে এলাম। ড্রাইভারকে জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, সামনে কোনও ভালো রেস্টুরেন্টে থামাতে,খুব খুদা লাগছে। খুদা অবশ্য লাগারই কথা তিনজন ননস্টপ কথা বলেই যাচ্ছিলাম। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের কেড়ে নিয়ে যেন চলছিল কথার প্রতিযোগিতা। অবশেষে সেই সামনেটা হলো মেঘনা ব্রিজ পেরিয়ে। একটি রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকলাম। নান রুটির সাথে ডাল অর্ডার করে অপেক্ষা করছিলাম। ওয়েটার বলল,নান রুটি হবেনা। পরোটা হবে। জাহাঙ্গীর ভাই কিছুটা উত্তেজিত গলায় বললেন,যা আছে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। কয়েক মিনিট পর পরোটার প্লেট আর ডালের বাটি সামনে রেখে গেল ওয়েটার। খাবার দেখতে ছিল আকর্ষণীয়। খেয়েও আমরা সবাই সন্তুষ্ট। সব শেষে চা-পান করে উঠে পড়লাম। দাউদকান্দি ব্রিজ পেরিয়ে ডান দিকে শ্রীরায়ের চর রাস্তায় ঢুকলাম। সামনে বিশাল বড় এক ট্রাক। গোটা রাস্তা দখল করেছে। ট্রাকটিকে ওভারটেক করে সামনে যাওয়ার মতো ফাঁক নেই রাস্তায়। ট্রাক একটু যায়,একটু থামে। পিছন পিছন আমাদের গাড়ি। এভাবে যেতে যেতে ট্রাকটি সামনে গিয়ে ডানদিকের আরেকটি রাস্তায় ঢুকল। আমরা সোজা চললাম। ট্রাকের পিছনে আটকা পরে দু মিনিটের পথ যেতে আমাদের সময় লাগল প্রায় পনের মিনিট। এবার একটাই পথ তবে আঁকাবাঁকা। যে জন্য কম গতিতে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল। প্রায় পাঁচ কি.মি. পথ পেরিয়ে গাড়ির চালক মুখ খুললেন। এক এক করে বলতে শুরু করলেন,এই পথে পূর্বে কবে কবে এসেছিলেন। তার সঙ্গে পথে কিছু কিছু জায়গা দেখিয়ে বলছিলেন, তিনি এখানে এসেছেন,সেখানে এসেছেন। এরপর আমরাও তাকে নানারকম প্রশ্ন করছিলাম। যাচ্ছিলাম লেংটার মেলা নামে খ্যাত হযরত সোলেমান শাহ (র:)-এর মাজারে। গাড়ি চালকের কাছে সোলেমান শাহ (র:) সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বললেন, 'সোলেমান শাহ উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান আউলিয়ার দাবিদার। তিনি পোশাক পরিধান করতেন না আর তাই লেংটা বাবা নামেও পরিচিত। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মতলবের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিয়ে করেছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সারাদেশ ঘুরে বেড়ালেও মতলবের বেলতলীতে বেশিরভাগ সময় থাকতেন। ওরসের সময় এই বেলতলীতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। আশে-পাশের কয়েক গ্রামজুড়ে ভক্তেরা থাকেন। কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে বসে ভান্ডারী, মারফতী ও বাউল গানের আসর। এছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবারও গানের আসর জমে। অনেকে এ আসরকে লেংটার মেলা, পাগলের আসর, পাগলের মেলাও বলে।

লেংটার মেলা সম্পর্কে আগেও অনেকের কাছে শুনেছিলাম। পত্র-পত্রিকাতেও অনেক লেখা পড়েছি। তবে এবারই প্রথম যাওয়া। শ্রীরায়ের চর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটারের বেশি পথ ভিতরে এসে খাড়া একটি ব্রিজ পড়ল। সম্ভবত এটি বাগারবাড়ী ব্রিজ। ব্রিজ থেকে দুদিকে দুটি পথ দেখতে পেলাম। আমরা বাঁ দিকের রাস্তায় এগোলাম। সব মিলিয়ে দাউদকান্দি ব্রিজ থেকে প্রায় পঁচিশ কি.মি. পথ পেরিয়ে একটু দূর থেকে চোখে পড়ল, দু'তিনটি মিনার। বুঝতে পারলাম চলে এসেছি বেলতলী। গাড়ি নিয়েই সরাসরি ঢুকে গেলাম মাজার গেটের সামনে। লাল ইট বিছানো পিচ ঢালাই বিহীন পথ। দু'পাশে গামছার দোকান। মাজার গেটের কাছাকাছি আগরবাতি, মোমবাতি, ফিতে, সন্দেশ ও তবারকের দোকান। দেখতে পেলাম মাজারের মূল ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ চলছে। ভক্তদের আনাগোনা একেবারেই চোখে পড়ল না। হাতে গোনা কয়েকজনকে দেখলাম মাজার জিয়ারত করছেন। দু'একজনকে দেখলাম মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে দুহাত পেতেছেন। তবে বেলা গড়ালে মানুষের আনাগোনা বাড়বে বলে মনে হল। ভাগ্যবসত সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। আর তাই ঠিক করলাম রাত পর্যন্ত থেকে গানের আসর দেখে যাব। এবার সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সাদুল্যাপুর। শাকিলের এক আত্মীয়র বাড়িতে। বেলতলী থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। দুপুরে পেট শান্ত করে আবার বের হলাম। এবারের গন্তব্য ষাটনল লঞ্চঘাট। সাদুল্যাপুর থেকে ঘন্টাখানেক সময় লাগল। পিচঢালা পথ থেকে নেমে কাঠের সাঁকোতে হেঁটে লঞ্চঘাটে প্রবেশ করতে হয়। হেঁটে যাওয়ার সময় সাঁকোর নীচ থেকে একজন মহিলা ডাকল। তাকিয়ে দেখি দুজন মহিলা নৌকায় মাছ ধরেছে। আমাদের মাছ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল,কিনব নাকি? কথায় কথায় যখন তারা জানল আমরা ঢাকা থেকে এসেছি, মাছের দাম চাইল,১৮০০ টাকা। যার দাম কিনা খুব বেশি হলে ৪০০ টাকা হবে। আমরা কথা না বাড়িয়ে এড়িয়ে চলে গেলাম। লঞ্চঘাটে দীর্ঘ সময় কাটল। প্রতি আধঘন্টা পর পর ঘাটে লঞ্চ ভিড়তে দেখলাম। লঞ্চগুলো একেবারেই ছোট ছোট। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাদপুর। আবার চাদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে ছোট এ লঞ্চগুলো এখানে ভেড়ে। বড় এবং বরিশালগামী দূর পাল্লার লঞ্চগুলো এখানে দাঁড়ায় না। 

সন্ধ্যার হওয়ার পর ষাটনল থেকে সাদুল্যাপুর পৌঁছে বেলতলীর দিকে যাওয়ার পথে গান বাজনার আওয়াজ কানে আসছিল। সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলাম পুরোপুরি জমজমাট অবস্থা। নানান কিসিমের মনোরোগী চোখে পড়ল। শুধু পুরুষই নয় মহিলার সংখ্যাও অনেক। মূল মাজার দালান ব্যতীত পাশের একটি করে বড় কক্ষ বিশিষ্ট আলাদা আলাদা দালানের ভেতরে বসেছে গানের আসর। একেকটা দালানের ভেতর আলাদা আলাদা গানের দল। ভিন্ন ভিন্ন গান গাইছে। বাজছে তবলা, ঢোল, বাঁশি, হারমোনিয়াম। গানের তালে তালে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছে, কেউ বসে চোখ বন্ধ করে তালে তালে মাথা নাড়ছে। আবার কেউ দাঁড়িয়ে গানের তালে তালে শরীর নাড়াচাড়া করছে। কেউ কেউ শুধু হাততালি দিচ্ছে। ভেতরে ফ্যান বন্ধ। জ্বলছে আগর বাতি, মোমবাতি। সব দালানের ভেতরেই একই চিত্র দেখতে পেলাম। সব আসরেই পুরুষের সঙ্গে প্রায় সমান সংখ্যক নারীদেরও তালে তালে নাচতে দেখলাম। ঘুরে ঘুরে দেখার সময় লক্ষ্য করলাম, একটি দালানের ভেতর গানের আসরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে লাল শার্ট পরনে একজন পাগল। মাথায় চুল নেই। প্রথমে দেখি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়াচাড়া করছে। এভাবে কয়েক মিনিট পর পর সে দু'হাত উঠিয়ে সোজাসুজি ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করার সঙ্গে সঙ্গে নাচতেও লাগল। তারপর আবার আগের মতো দাঁড়িয়ে মাথা নাড়াচাড়া করতে থাকল। মাজার এলাকায় দোকানগুলোতে যেকোনও পণ্য কিনতে প্যাকেটে লেখা মূল্যের চেয়ে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হল। একটু পর গান বাজনার আওয়াজ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। দেখলাম সবগুলো আসরের ভেতরেই সবাই খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। এরপর আবার গান বাজনা হবে কিনা তা দেখার জন্য আর অপেক্ষা করলাম না। বাড়ি ফেরার জন্য গাড়িতে উঠে পড়লাম।

Monday, August 8, 2016

বিচিত্র অভিজ্ঞতার একরাত!

অন্যরকম খোলামেলা কথাবার্তার ভ্রমণ গল্প 


রফিকুল ইসলাম সাগর :: বন্ধু সুমন রাত ১১টায় ফোন করে বলল, তার এক আত্বীয়কে কালিগঞ্জ নামিয়ে দিয়ে আসতে যাবে। আমি সাথে যেতে পারব কিনা জানতে চাইল। আমি মুহুর্তেই রাজি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পরলাম। ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে আমার আবার অন্যরকম নেশা। সুমনের নিজের প্রাইভেট কার। আমাকে বাড়ীর সামনে থেকে এসে নিয়ে গেল। গাড়িতে বসে সুমনের আত্বীয়র সাথে পরিচিত হলাম। নাম জমির। আমাদেরই সমবয়সী। 

গাড়ি ড্রাইভ করেছে সুমন। পূবাইল পার হওয়ার পর পুলিশের চেক পোস্ট। সেখানে একটি দামী কালো গাড়ি থামানো দেখতে পেলাম। গাড়ির বাইরে দুইটা ছেলে একটা মেয়ে। যদিও আমাদের গাড়ি পুলিশ থামতে সিগনাল দেয়নি। আমরা নিজে থেকেই গাড়ি রাস্তার পাশে চাপিয়ে নামলাম জানতে কাহিনী কি! একজন পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, মামা কি হইছে? কাহিনী কি? উত্তরে জানলাম গাড়িতে 'মাল' পাওয়া গেছে (মাল মানে মাদক দ্রব্য)। আমরা আর সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠলাম। চলতি পথে জমির এলাকায় তার প্রভাব সম্পর্কে গল্প করছিল। তার কথাবার্তায় বুঝে নিলাম ব্যাটার ক্ষমতা আছে। সে একটা কথা বারবার বলছিল যে, 'এলাকায় আমগো উপরে কোনো নেতা নাই। আমরাই সব'। কথার মাঝে জমিরের মোবাইলে একটা ফোন এলো। ফোনে যার সাথে কথা বলছে তাকে সম্ভবত কোনো একটা কাজে পাঠিয়েছে, কিন্তু লোকটা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এপাশ থেকে জমির একটা কথা বারবার বলছিল 'মিডিয়া কর', মিডিয়া কইরা কামডা যেমনেই হউক শেষ কইরা আয়। এখানে 'মিডিয়া কর' মানে হচ্ছে কাজটা যে পারবে তার সাথে যোগাযোগ কর। জীবনে প্রথম আমি 'মিডিয়া কর' টাইপের ডায়লগ শুনলাম। এই মিডিয়া কর শব্দটা আমার দারুন পছন্দ হয়েছে। 
চলতে চলতে নানান রকমের কথায় কথায় এর মধ্যে আমরা গৌন্তব্যে পৌছালাম। গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে। জমির ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় বন্ধু বলে। আরও বলে, 'এই এলাকায় আমরা দুজনেই সব। এইখানে যদি এখন পুলিশের গাড়ি আসে আমগো দুইজনকে দেখলে সালাম দিয়া চইলা যাইব।' সাথে জমিরের বন্ধুটাও তাল মিলিয়ে বলল, 'আপনেরা মিয়া এইহানে অহন কাউরে মার্ডার করলেও পুলিশ আমারে দেখলে আপনেগরে ছাইরা দিব। আমার নাম মুন্না।' আমি বললাম, আরে কি কন! মার্ডার করব কারে? মুন্নার হয়ে জমির উত্তর দেয়, আরে কথার কথা কইল আরকি। 
মনে মনে ভাবলাম, খাইছে কি ক্ষমতা। তবে জমিরের কথাবার্তা শুনে আমার সব বিশ্বাস হলেও মুন্না ছেলেটার সব কথাই কেমন যেন চাপা চাপা মনে হচ্ছিল। ওর চেহারা আর পড়নের পোশাক দেখে কোনভাবেই মিলাতে পারছিলাম না ওর এতো ক্ষমতা। চেহারা দেখলেই বুঝা যায় বয়স একেবারে কম এবং কথাবার্তার মধ্যেও একটা বাচ্চামি ভাব প্রকাশ পায়। আমি আর সুমন কানাকানি করলাম, মনে হয় সব চাপা মারছে।
ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১টা কি তার একটু বেশি। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পিচঢালা পথ থেকে প্রায় পঞ্চাশ কদম সামনে একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। উঠোনে লাইটের আলো। চারিদিকে ঝিঝি পোকা ডাকছে। আমরা ঢাকা ফেরার জন্য দুজনের কাছে বিদায় চাইলাম। কিন্তু না ওরা এখন, আমাদের যেতে দিবেনা। দুজনের আবদার, গরিবের বাসায় যেতে হবে। আমরা আপত্তি করলাম। বললাম, নাহ এতো রাতে কারো বাড়িতে যাব না। এরপর জমির সামনের বাড়িটি দেখিয়ে বলল, 'আইচ্ছা ঠিক আছে আসেন এইটা আমার চাচার বাড়ি। চাচা যাইগ্গা আছে। চাচার ঘরে গিয়া বসি। নাইলে খুব কষ্ট পামু।' পাশ থেকে মুন্না বলল, 'ভাই আমরা হারারাইত ঘুমাই না। সহালে বাড়িত গিয়া ঘুমাই।'
সুমন গাড়ি রাস্তার পাশে চাপিয়ে রাখল। বাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে সুমন মুন্নাকে প্রশ্ন করলো, গাড়ি এখানে রাখলে কোনো সমস্যা নেইতো? মুন্না খুব ভাব নিয়ে উত্তর দিল, আরে নাহ গাড়ি কেউ দরত না। আপনেরা মুন্নার কাছে আইছেন বুঝলেন। গাড়ি কেউ নিলে আপনেরে আমি জরিপানা দিমু (একটু জোর গলায় বলল)। এবার সুমন নিশ্চিন্ত মনে বলল, চলেন। 
বাড়িতে ঢুকতে পথের দুপাশে সুপারি গাছ। সাথে সাইডে বড় বড় গজারী গাছ। হেটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। একটি ঘরের দরজার এপাশে দাড়িয়ে জমির ডাক দেয়, কাকা...। ভেতর থেকে সাথে সাথেই উত্তর, কেডা? জমির উত্তর দেয়, আমি জমিরে দরজা খোল। ঢাকা থেইকা মেমান আইছে। 
দরজা খুললেন একেবারে চিকন-চাকন আকৃতির একজন লোক। চোখে চশমা। তিনি সম্ভবত লেখা পড়তে চশমা ব্যবহার করেন। ঘরে ঢুকে দেখতে পেলাম তার হাতে কিসের যেন একটা কাগজ। সম্ভবত কাগজের লেখা গুলো পড়ছিলেন। আমাদের দেখে কাগজটা বিছানার পাশে একটা টেবিলে রাখলেন। তারপর চোখের চশমাটা খুলে সেই কাগজের উপর রাখলেন। এবার জমির চাচার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। চাচা আমাদের বসতে বললেন। বিছানার উপর উঠে বসলাম। 
জমির চাচা সম্পর্কে বলতে শুরু করে, 'এইযে আমার কাকা হের সাথে আমি পুরা ফ্রি মাইন্ডে চলি। একবারে বন্ধুর মতো। আমার কাকা এই পুরা গ্রামের সবচেয়ে বড় নেতা। দুইবার বলল, সভাপতি সভাপতি। হেয় খালি একটা ফুন মারব এক্ষণ পুলিশ আইব।' 
একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম-জমির ও মুন্না দুজনেই প্রথম থেকেই বারবার পুলিশ পুলিশ করছে। তো এরপরে কথার মাঝে চাচার মোবাইলে ফোন এলো। তিনি রিসিভ করে কথা বলছেন। আমরা চুপচাপ বসে সবাই শুনছি। বুঝলাম ফোনে কেউ তার সাথে মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কথা বলছে। কেউ একজন মামলা করেছেন যার নামে মামলা করেছেন তাকে পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে। 
ফোনে চাচা কিছু কথা বললেন এরকম, 'মামলা করতে ট্যাকা কতো দিছে? খবর পাইছত? দশ হাজার ট্যাকা! মামলা করতে দশ হাজার ট্যাকা লাগে নাকি? আমারে এক হাজার ট্যাকা দিলেই এমন মামলা করাইতাম আর বাইরন লাগত না। থাক হেগো ট্যাকা বেশি অইয়্যা গেছে দিছে।' বলে কথা শেষ করলেন। 
আমি জমিরের চাচার দিকে তাকিয়ে ভালোভাবে তাকে দেখলাম। কোনভাবেই তাকে আমার দৃষ্টিতে নেতা নেতা মনে হচ্ছিল না। আবার মনে করলাম নাহ! লোকটা অনেক বড় নেতা হলেও হতে পারে। গ্রামের নেতা তো। 
এরমধ্যে জমির তার এক বন্ধুকে ফোন করে বলল, 'ঢাকা থেইক্কা মেমান আইছে খাওনের কিছু নিয়া আয়। এক্ষণ আবি। দেরী করবি না। তুই তর ট্যাকা দিয়া নিয়া আয়, আইলেই আমি দিয়া দিতাছি।' আমি প্রশ্ন করলাম, এতো রাতে দোকান খোলা পাবে? সাথে সাথেই মুন্নার উত্তর, খুলা না থাকলেও খুলাইব। 
প্রায় ঘন্টা খানেক পর মোটর সাইকেল চালিয়ে একজন বাড়ির ভেতর ঢুকলো। তখন জমির ঘর থেকে বের হলো। মিনিট পাঁচেক পর মোটর সাইকেল স্টার্ট দেয়ার শব্দ শুনলাম। বুঝতে পারলাম মোটর সাইকেল চালিয়ে যে এসেছিল সে জমিরের সাথে কথা বলে চলে গেল। জমির ঘরে ঢুকলো। ওর চেহারায় একটু রাগ রাগ ভাব খেয়াল করলাম। ঘরে ঢুকেই জমির চাচার কাছে নালিশ করলো, 'চাচা, সবুইজ্জার কামডা দেখছেন এতক্ষণ পরে আইয়্যা কয় হের কাছে ট্যাহা নাই। এই কয়ডা ট্যাহা হের কাছে নাই? ওরে কি কেউ বাকিও দিতনা? আমার কাছ থেইকা আইয়্যা ট্যাহা নিয়া গেল।' 
জমিরের নালিশ শুনে চাচা বললেন, 'সবুইজ্জার কাছে ট্যাকা থাকব কেমনে! সারাদিন জুয়া খেলে। ঘরের সব জিনিস জুয়া খেইল্লা বেচ্ছে। দেখ অহন আবার গিয়া জুয়া খেলতে বইছে।' চাচার এসব কথা শুনে সবুজের মোবাইলে ফোন করে জমির। ওপাশ থেকে রিসিভ করেনা। অসংখ্য বার ট্রাই করার পর প্রায় মিনিট বিশেক পর ফোন রিসিভ করলো। বলল, পাচ মিনিট লাগবে আসতে। পাচ মিনিট পেরিয়ে ত্রিশ মিনিট হয়ে গেল সবুজের কোনো খবর নাই। ফোন করলে রিসিভ করেনা। একঘন্টা পর আবার ফোন রিসিভ করলো। এবার বলল, এইতো আর দুই মিনিট লাগবে। দুই মিনিট শেষ হলো আরও একঘন্টা পর। মোটর সাইকেলের আওয়াজ শুনে মুন্না বলল, আইছে...। একটা ছেলে ঘরে ঢুকলো। এই ছেলেটার নামই সবুজ। মুন্নার হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে 'একটু কাম আছে। আইতাছি।' বলে সে কেটে পড়ল। 
ব্যাগের ভেতর থেকে মুন্না দুই প্যাকেট বিস্কুট আর এক লিটার প্রাণ আপ এর বোতল বের করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ভাই নেন খান। বিস্কুট খাওয়া শুরু করলাম। চাচা একটি বিস্কুট হাতে নিয়ে কয়েক লাইন জ্ঞানের কথা বললেন। কথা গুলো হলো- 'এই যে আমরা প্রত্যেক দিন ভাত, মাছ, মাংশ, তরকারি খাই। প্রথমে বাজার কইরা আনন লাগে। আননের পরে মহিলারা ছুইলা-কাইডা, ধুইয়্যা এগুলা চুলার সামনে হাজির করে। পরে চুলাত বহায়। এরপরে রান্ধন অয়। তারপরে গিয়া প্লেটে কইরা আমগো সামনে দেয়। এতো কষ্ট কইরা জিনিসটা তৈয়্যার অয়। খাইতে কিন্তু লাগে মাত্র পাচ মিনিট।' চাচার এমন উদহারণ দেয়ার কারণ বুঝতে আর বাকি রইলো না। 
খাওয়া শেষ করে আমি আর সুমন ঢাকা ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরলাম। চাচার কাছে বিদায় নিলাম ঘরের ভেতরেই। জমির আর মুন্না আমাদের এগিয়ে দিতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গাড়ি পর্যন্ত এলো। ঠিক তখনি অনেকটা দূরে একটা গাড়ির হেড লাইটের আলো চোখে পড়ল আমাদের সবার। দূর থেকে ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না গাড়িটা কোন ধরনের। গাড়িটা আমাদের দিকে এই পথেই আসছে। এই মুহুর্তে জমির তারাহুরা করে আমাকে আর সুমনকে বলল, ভাই আপনেরা একটু বাড়ির ভিতরে যান। আমি বললাম, কোনো সমস্যা? জমির বলল, না সমস্যা না। একটু পরে যান। এখন চাচার ঘরে যান। ফোন করলে বাইরইবেন। 
কথা না বাড়িয়ে আমি সামনে সুমন পিছনে বাড়ির ভেতরে যেতে হাটা শুরু করলাম। মাঝ পথে সুমন বলল, দাড়া তো দেখি কাহিনী কি! দাড়িয়ে গেলাম। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি সুমন একটা গজারী গাছের পেছনে দাড়িয়ে মাথা একটু বাঁকা করে উকি দিয়ে দেখছে। আমাকে ইশারা করলো, চুপ কোনো কথা বলবি না। আমিও ঠিক একই পজিশনে দাড়িয়ে উকি দিয়ে রইলাম। দেখলাম, জমির ও মুন্না আমাদের গাড়ির ওখানেই দাড়িয়ে আছে। দূর থেকে যে গাড়িটা এদিকে আসছে ওদের দৃষ্টি সেদিকে। গাড়িটা একেবারে কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলাম জমির আর মুন্না দুইজন দুইদিকে দৌড় দিল। আমরা আড়াল থেকে দেখলাম, গাড়িটা ছিল পুলিশের। বুঝলাম ওরা দুইজন পুলিশ বুঝতে পেরেই দৌড় দিয়েছে। পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর জমিরের ফোন পেয়ে এসে দেখলাম ওরা দুজন এমন ভাব করে দাড়িয়ে আছে যেন এতক্ষণ এখানেই দাড়িয়ে ছিল। আমরাও ওদের প্রকাশ করিনি যে আমরা সব দেখেছি। এই দৃশ্য দেখার পর আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না, বেটারা কতবড় চাপাবাজ। পাঠক আপনারাও নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি চাপাবাজি গুলোই হজম করলাম।
ঘড়ির কাটায় তখন সাড়ে চারটার মতো বাজে যখন আমরা ঢাকা ফিরতে রওনা করলাম। আমি আর সুমন শেষের ঘটনা মনে করে করে গোটা পথে হাসতে হাসতে বাড়ি পৌছালাম।

Saturday, October 10, 2015

বাংলার অজপাড়া এক গাঁয়ে

রফিকুল ইসলাম সাগর



সকাল সোয়া দশটা। মহাখালী বাস টার্মিনাল এসে দশ মিনিটের জন্য বাস মিস করলাম। মাসুল গুণতে হল দেড় ঘন্টা। পরের বাস বেলা সাড়ে এগারটায়। ততক্ষণ টার্মিনালের ভেতরেই অপেক্ষা। সময় কাটল খুবই অস্থিরতায়। এর মধ্যে কতবার যে ওয়েটিং রুমের সিট থেকে উঠে বাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়েছি তার হিসেব নেই। এগারটা বেজে কুড়ি মিনিট। একজন এসে বলল, 'সিলেট এগারটা ত্রিশের যাত্রীরা আমার সাথে আসেন'। ওঠার পর ঠিক সময়েই বাস ছাড়ল অবশ্য।
ভৈরব পর্যন্ত যানজটবিহীন আরামেই যাচ্ছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামের কারণে ভৈরব দূর্জয় মোড় থেকে ব্রিজ পার করতে দশ মিনিটের পথ প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগে গেল। এবার বি-বাড়িয়া বিশ্বরোড পৌঁছলে বাস থেকে নেমে চার'শ টাকায় ভাড়া করা সিএনজি অটোরিক্সায় উঠলাম। আগামী গন্তব্য ফান্দাউক। প্রায় দশ মিনিটের পথ এগিয়ে সড়কের পাশেই বাঁদিকে একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প চোখে পড়ল। অটোরিক্সা চালক জানালেন, এটা বাংলাদেশের ছ'টি বড় বিজিবি ক্যাম্পের একটি। 
দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা অটো সরাইল পেরিয়ে যাওয়ার সময় সড়কের দু'পাশে দেখতে পেলাম দূরদূরান্ত পর্যন্ত পানি আর পানি। থৈ থৈ পানির বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ট্রলার আর নৌকা। ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছে। আশেপাশে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ল না। প্রচণ্ড বাতাস। যাকে বলে প্রাণ জুড়োনো বাতাস। অটোরিক্সার প্লাস্টিকের বডিতে বাতাসের আঘাত করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মুখটা একটু বাইরে বার করে বাতাসের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করলাম। আহ! এসব অনুভূতির জন্যই মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় - কথাগুলো মনে এল। ততক্ষণে ফান্দাউক পৌঁছে গেছি। ভাড়া মিটিয়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। খানিক এগোতে সামনেই বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পেরিয়ে আবার তার জন্য টোল পরিশোধ করতে হল জনপ্রতি পাঁচ টাকা! সাঁকোটির হাল দেখে মনে হল, টোলের টাকা সাঁকোটি মেরামতের কাজে ব্যবহার হয় না। এখানে টোল আদায় শুধুমাত্র ধান্দাবাজি। এ ব্যবসা অবশ্য আর বেশিদিন চলবেনা - পাশেই দেখতে পেলাম সেতু নির্মাণের কাজ অর্ধেকেরও বেশি হয়ে গেছে। শেষ হলে এই পথে সরাসরি বাস চলবে।
বিখ্যাত ফান্দাউক বাজারের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নজর পড়ল একটা মিষ্টির দোকানের ভিতরে। রসমালাই দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। বেশ ভিড়। ভেতরে বসার জায়গা পেলাম না। দাঁড়িয়েই একবাটি রস মালাই খেয়ে আরো দু কেজি প্যাকেটে দিতে বললাম। ঢাকার থেকে ঢের সস্তা। আরো দু'কেজি অন্য মিষ্টিও কিনে নিলাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটে এবার ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সায় বামৈ পর্যন্ত গেলাম। পঁচিশ মিনিটের মতো সময় লাগল। এখনও অবশ্য কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাইনি।
সকাল সোয়া দশটা। মহাখালী বাস টার্মিনাল এসে দশ মিনিটের জন্য বাস মিস করলাম। মাসুল গুণতে হল দেড় ঘন্টা। পরের বাস বেলা সাড়ে এগারটায়। ততক্ষণ টার্মিনালের ভেতরেই অপেক্ষা। সময় কাটল খুবই অস্থিরতায়। এর মধ্যে কতবার যে ওয়েটিং রুমের সিট থেকে উঠে বাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়েছি তার হিসেব নেই। এগারটা বেজে কুড়ি মিনিট। একজন এসে বলল, 'সিলেট এগারটা ত্রিশের যাত্রীরা আমার সাথে আসেন'। ওঠার পর ঠিক সময়েই বাস ছাড়ল অবশ্য।
ভৈরব পর্যন্ত যানজটবিহীন আরামেই যাচ্ছিলাম। অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামের কারণে ভৈরব দূর্জয় মোড় থেকে ব্রিজ পার করতে দশ মিনিটের পথ প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগে গেল। এবার বি-বাড়িয়া বিশ্বরোড পৌঁছলে বাস থেকে নেমে চার'শ টাকায় ভাড়া করা সিএনজি অটোরিক্সায় উঠলাম। আগামী গন্তব্য ফান্দাউক। প্রায় দশ মিনিটের পথ এগিয়ে সড়কের পাশেই বাঁদিকে একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প চোখে পড়ল। অটোরিক্সা চালক জানালেন, এটা বাংলাদেশের ছ'টি বড় বিজিবি ক্যাম্পের একটি। 
দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা অটো সরাইল পেরিয়ে যাওয়ার সময় সড়কের দু'পাশে দেখতে পেলাম দূরদূরান্ত পর্যন্ত পানি আর পানি। থৈ থৈ পানির বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ট্রলার আর নৌকা। ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছে। আশেপাশে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ল না। প্রচণ্ড বাতাস। যাকে বলে প্রাণ জুড়োনো বাতাস। অটোরিক্সার প্লাস্টিকের বডিতে বাতাসের আঘাত করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। চুলগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মুখটা একটু বাইরে বার করে বাতাসের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করলাম। আহ! এসব অনুভূতির জন্যই মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় - কথাগুলো মনে এল। ততক্ষণে ফান্দাউক পৌঁছে গেছি। ভাড়া মিটিয়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। খানিক এগোতে সামনেই বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পেরিয়ে আবার তার জন্য টোল পরিশোধ করতে হল জনপ্রতি পাঁচ টাকা! সাঁকোটির হাল দেখে মনে হল, টোলের টাকা সাঁকোটি মেরামতের কাজে ব্যবহার হয় না। এখানে টোল আদায় শুধুমাত্র ধান্দাবাজি ব্যবসা। এ ব্যবসা অবশ্য আর বেশিদিন চলবেনা - পাশেই দেখতে পেলাম সেতু নির্মাণের কাজ অর্ধেকেরও বেশি হয়ে গেছে। শেষ হলে এই পথে সরাসরি বাস চলবে।
বিখ্যাত ফান্দাউক বাজারের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নজর পড়ল একটা মিষ্টির দোকানের ভিতরে। রসমালাই দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। বেশ ভিড়। ভেতরে বসার জায়গা পেলাম না। দাঁড়িয়েই একবাটি রস মালাই খেয়ে আরো দু কেজি প্যাকেটে দিতে বললাম। ঢাকার থেকে ঢের সস্তা। আরো দু'কেজি অন্য মিষ্টিও কিনে নিলাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটে এবার ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সায় বামৈ পর্যন্ত গেলাম। পঁচিশ মিনিটের মতো সময় লাগল। এখনও অবশ্য কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাইনি।

"বাকিটা পথ যেতে হবে 'বামৈ নাউ ঘাট' থেকে ইঞ্জিন চালিত কাঠের নৌকায় চড়ে (নৌকার স্থানীয় নাম 'নাউ')। ঘাটে পাঁচ-ছ'টি নৌকা দেখতে পেলাম। দেখতে প্রায় একই রকমের সবকটা। আকারে খুব বড় না। ঘরের মতো চারদিক বন্ধ। ওপরে টিনের চাল। সামনে পিছনে দরজার মতো ফাঁকা দুটি প্রবেশ পথ। দু'পাশে তিন-চারটি জানালা। শিশু ও মহিলারা বসেছে ঘরের ভিতর। পুরুষরা টিনের চালের ওপর। অন্যদের মতো আমিও বসলাম চালের ওপরেই। একে একে সংখ্যায় আমার ধারণার বেশি যাত্রী উঠলো। তারপরেও মাঝি আরও যাত্রী নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। মাঝির সঙ্গে নৌকার হেলপার একটি শিশু। শিশুটি একটু পরপর উচ্চস্বরে ডাকছে, 'জিরু ন ন ন ন ন ন ন্ডা'। নৌকোটা টলমল করতে দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম, যদি ডুবে যায় এই ভেবে। আর তখনই নৌকার মাঝি যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, 'নাউ গড়াইতাছে! সামনে পিছে মিল্লা বও'। আরো ক'জন যাত্রী উঠল নৌকায়। অতঃপর ঘাট থেকে একজন নাউ ছাড়ার নির্দেশ দিল। ইঞ্জিন স্টার্ট করে নাউ নিয়ে এগিয়ে চলল মাঝি। অধিক যাত্রীর ভারে নৌকা প্রায় ডোবে-ডোবে অবস্থা। আমার মনে আতঙ্ক! এমনভাবে যাতায়াত করা এখানের মানুষের কাছে হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু আমি ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছিলাম না। 
বেলা প্রায় শেষের দিকে। পশ্চিমের আকাশের একাংশে একটু আগুনের রঙের মতো লালচে দাগ। কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতার মাঝে ব্যাঙের ডাক আর নৌকার ইঞ্জিন ঘোরার শব্দ। এর সঙ্গে সূর্যটা যেন ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেমন জানি ঝিম-ম-ম অনুভূতির মাঝে হারালাম। সমস্ত শরীরে বাতাসের আঘাত গোটা দিনের সব ক্লান্তি তাড়িয়ে দিচ্ছিল। আলো তখনও পুরোপুরি অন্ধকারে হারায়নি। বিদ্যুতের ভোল্টেজ একেবারেই কম থাকলে একটা বাল্বের আলো যেমন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায় ঠিক তেমনি সূর্যের আলোর নিভু নিভু ভাব। হঠাৎ সূর্যটা হারিয়ে গিয়ে চারিদিকে অন্ধকার নামিয়ে গেল। প্রতিদিন ঠিক একইভাবে সূর্য আসা-যাওয়া করে। পার্থক্য শুধু আগেরদিন সূর্যডুবির এ দৃশ্য দেখেছিলাম ঢাকার আকাশে। ঘড়ির কাঁটা সেকেন্ড তারপর মিনিট এভাবে এগোচ্ছে। এরই মাঝে সেই শিশুটি এসে ভাড়া চাইল, মাথাপিছু দশ টাকা। ততক্ষণে 'জিরুন্ডা' গ্রামের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছি, আর হয়তো মিনিট দশ।

নৌকায় থাকা যাত্রীদের প্রস্তুতি দেখে বুঝতে বাকি রইল না, জিরুন্ডা এসে গেছি। আধঘন্টা কেটে গেছে এরমধ্যেই। ঘাটে পৌঁছাবার আগেই ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন মাঝি। চিকন মাপের বাঁশ হাতে নিয়ে এবার তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বাঁশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে নৌকা ঘাটে ভেড়ালেন। ভেবেছিলাম এখানেই নামতে হবে। মাহমুদ ভাই বললেন, এ ঘাটে নামব না। একজন মহিলা ও শিশুকে নামিয়ে আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন মাঝি। দু'মিনিট পর একইভাবে আরেক ঘাটে ভেড়ানো হলো নৌকা। এখানেও নামল ক'জন। এভাবে চারটি ঘাট পর অবশেষে পৌঁছলাম জিরুন্ডা গ্রামে। লোকাল বাসে চড়েছি, লোকাল ট্রেনে চড়েছি, জীবনে এই প্রথম লোকাল নৌকায় চড়লাম। ঘাটে ঘাটে যাত্রী নামানো দেখার অভিজ্ঞতা প্রথম বলে হয়তো দারুণ মনে হল। যেই নৌকাটিতে করে এখানে এলাম এটি নাকি ছিল এ পথের লাস্ট ট্রিপ। সকাল পর্যন্ত আর কোনও নৌকা চলবে না। কোনও কারণবশত যদি কেউ বামৈ থেকে রওনা দিতে দেরি হয়ে যায় তাহলে জিরুন্ডা ফিরতে তার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রাতে ডাকাতির সম্ভাবনা আছে বলে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে। রাতযাপন করলাম এক নিকট আত্বীয়ের বাড়িতে - পনেরদিন আগেও নাকি এটি পুরোপুরি পানিবন্দী ছিল। রাত পেরিয়ে সকাল বেলা গ্রামের পুরোপুরি রূপ ধরা দেয় আমার দৃষ্টিতে। যে রূপ রাতের আঁধারে ছিল অস্পষ্ট। আশপাশ ঘুরে দেখলাম এখনো অনেক বাড়ি পানির মাঝে উঁকি দিয়ে আছে। 
জিরুন্ডা গ্রামের নাম অনেক পাঠকই সম্ভবত এর আগে কোনদিন শোনেননি। আমি এ গ্রামের নাম প্রথম শুনি বছর তিনেক আগে। সেই তখন একবার এসেছিলাম, মাঝে পাঁচ-ছয় মাস আগে আরেকবার। জিরুন্ডা নামক গ্রামটি হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত, লাখাই থানার অন্তর্ভুক্ত। জিরুন্ডা এবং তার আশেপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম - মানপুর, সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাধানগর – এদের অজপাড়াগাঁ বলা চলে। গ্রামগুলোর বছরে দুই রূপ - জুলাই থেকে অক্টোবর বর্ষাকালীন একরূপ, আর বাকি মাসগুলোতে আবার অন্য রূপ। পূর্বে দু'বার যখন এসেছিলাম অনেকেই আমাকে বর্ষাকালে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বর্ষাকালে নৌকা একেবারে ঘরের দরজার সামনে আসবে, এমন কথা বলেছিল কেউ কেউ। সব মিলিয়ে এবার আমন্ত্রণে সাড়া দিতে পেরেছিলাম। বামৈ থেকে যখন নৌকায় উঠলাম তখন আগের দেখা অনেক কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। না পারাটাই স্বাভাবিক। জোয়ারের পানিতে পথ-ঘাট, মাঠ, ধানের ফসল, খাল-বিল, ঝিল সব মিলে মিশে একাকার। নৌকায় কয়েকজন জানায়, এখন তবু জোয়ারের পানি নামতে শুরু করেছে। এবারের বন্যায় নাকি গত কয়েক বছরের তুলনায় দ্বিগুণের চেয়েও দ্বিগুণ পানিতে ডুবেছিল। কিছু কিছু জায়গায় এখন পানি না থাকলেও, কিছুদিন আগেও নাকি পানিতে ডুবে ছিল, এমন কথাই বলাবলি করছিলেন গ্রামের ক'জন প্রবীণ।
জিরুন্ডাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষরা যোগাযোগসহ আধুনিক অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছুই প্রায় পাওয়া যায় না গ্রামে। বাজার আনতে যেতে হয় বামৈ নয়তো ফান্দাউক। সদরে বা রাজধানীতে যেতে হলে আগে যেতে হবে বামৈ। সেখান থেকে রাজধানী যাওয়ার বাস ছাড়ে দিনে দু'টি। তাও আবার লক্কর-ঝক্কর লোকাল বাস। গ্রামে পথচলার রাস্তা যতটুকু আছে তা না-থাকার মতোই। রিক্সায় চড়ে কিছুটা পথ যাওয়া গেলেও বেশ কয়েকবার যাত্রীকে নেমে হেঁটে সামনে গিয়ে আবার উঠতে হয়। হিসেব কষলে দেখা যায়, রিক্সায় বসে থাকার চেয়ে হেঁটেই বেশি পথ আসা হয়েছে। আর তাই দূরত্বের ব্যবধানটা অনেক বেশি হলেও, দীর্ঘ সময় লাগলেও প্রয়োজনে গ্রামের মানুষেরা পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করেন। গোটা কয়েক গ্রাম মিলিয়ে রিক্সার সংখ্যা হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা। বরং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকলেও সব মিলিয়ে এখানকার মানুষজনের বর্ষাকালেই চলাচলে সুবিধা – নৌকাতে – যখন খাল-বিল-পথ-মাঠ-ক্ষেত সব মিলেমিশে একাকার।

ঘড়ির কাঁটায় বেলা এগারটা। জিরুন্ডা গাঁয়ের নাউ ঘাটে বসে নৌকায় ওঠার জন্য অপেক্ষা। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর কিনতে বামৈ যেতে হবে। পনের মিনিট অপেক্ষা করে নৌকা পেলাম। গতরাতের মতো চালের ওপর উঠে বসলাম। রোদের তাপ একটু বেশিই মনে হল। পাশাপাশি একের পর এক ঘাট থেকে নৌকায় যাত্রী উঠছে। এই ঘুরপাকে কেটে গেল আধ ঘন্টার বেশি সময়। অথচ আধ কিলোমিটার পথও এগোতে পারিনি। এক পর্যায়ে খুব বিরক্ত লাগছিল। রোদের তাপ আরো বেশি মনে হচ্ছিল। কয়েকজন রোদ থেকে নিজেকে আড়াল করতে ছাতা মেলে ধরেছে মাথার ওপর। তাদেরকে এমন ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখে নিজেকে বড় অসহায় মনে হল। দেখলাম, বুড়ো মাঝিটাও একটা ছাতা মেলল। আমাকে ডাকল, তার পাশে আসার জন্য। আমার হাতে ছাতাটি ধরিয়ে দিয়ে তিনি ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন - তারপর আমার পাশে বসলেন। থৈ থৈ পানির বুকে ভাসছে নৌকা। মাঝি একটা লোহার হ্যান্ডেলের মাধ্যমে নৌকাটিকে ডানে-বায়ে নিয়ন্ত্রণ করছে - আমি আমাদের দুজনের মাথায় ছাতা ধরে! বুড়ো মাঝি একটু পরপর একটা করে বিড়ি জ্বালিয়ে ফুঁকছে। কিছু বলতে পারলাম না, রোদে পোড়ার চেয়ে বিড়ির ধোঁয়া বেশি উত্তম বলে তখন মনে হল।
জোয়ারের পানিতে গ্রামের মানুষের মাছ ধরার দৃশ্য আমার কাছে এক প্রকারের উত্সবের মত লাগে যাকে বলা যেতে পারে সিজনাল মাছ ধরার উত্সব। নৌকায় বসে দেখলাম এখানে-সেখানে অনেকেই সিটকি জাল পেতে বসেছে। আবার কেউ কেউ উড়াইন্যা জাল ব্যবহারে মাছ ধরছে। এছাড়া নৌকা থেকে জাল ফেলে ও বর্শি পেতেও মাছ ধরতে অনেকে ব্যস্ত। দেখে মনে হল, মাছের চেয়ে মাছ ধরার মানুষের সংখ্যা বেশি। বামৈ ঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগবে আর দু'তিন মিনিট। এ পথে অনেকগুলো মাছ ধরার জাল পাতা। আর তাই মাঝি খুব সতর্কভাবে নৌকা এগিয়ে নিচ্ছিল। ইঞ্জিন বন্ধ করে মাঝি এবার বাঁশ হাতে নিল। নৌকার ইঞ্জিনের পাখায় জাল আটকে গেলে ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নৌকা থেকে নেমে ঘাটে গতদিনের তুলনায় মানুষের আনাগোনা একেবারেই দেখলাম না।
আধঘন্টা পর আবার ঘাটে এসে সেই নৌকাটিতেই উঠলাম জিরুন্ডা যাওয়ার জন্য। যাত্রী সংখ্যা কম থাকলেও মাঝি আমাদের নিয়ে নৌকা ছাড়ল। একটু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর একজন মহিলা যাত্রী মাঝিকে ভেতর থেকে বলল, নৌকা ঘাটে ভেড়াতে। এ ঘাট থেকে তার লোক উঠবে। নৌকা ঘাটে ভিড়লে মহিলাটি জোরে চিত্কার করল, আফা - আফা (আপা) বলে। চিত্কারে পাশেই একটি বাড়ি থেকে শিশু-কোলে বয়স্ক একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। তাঁর কথায় বোঝা যাচ্ছিল, তিনি এখন যাবেন না, পরে আসবেন। আমাদের সবাইকে নৌকায় অপেক্ষা করিয়ে দুই বোনের আলোচনা চলছে..। আমার খুব বিরক্তি লাগছিল। মাঝির মুখের দিক তাকিয়ে বুঝলাম উনিও বিরক্ত। তাদের দীর্ঘ আলাপচারি ফুরোলে নৌকা ছাড়ল। যাত্রী কম হলেও নামানোর সময় এক-এক ঘাটে এক-একজন করে নামছে। গতদিন যাত্রী বেশি থাকলেও এতগুলো স্টপেজ দেয়নি। আমি যে ঘাটে নামব সেটি এল একেবারে শেষে। নেমে কোমর টনটন করছে দেখে শরীরটা একটু নাড়াচাড়া করে নিলাম। 

জিরুন্ডা ফিরে দুপুরের খাওয়া শেষে বেড়াতে বেরোলাম। কাঁচা মাটির পথে হেঁটে যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম আমার দিকে গ্রামের মানুষগুলোর কেমন জানি ভিন্ন দৃষ্টি। যেন বড় মাপের কোনো তারকা! মহিলারা বাড়ির উঠোনে আমাকে দেখতে ভিড় করেছে। লজ্জায় মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে উঁকি দিয়ে দেখছে। যেদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, সবাই আমাকে নিয়েই যেন কথা বলাবলি করছিল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর এমন কাণ্ডে এক পর্যায়ে নিজেও লজ্জা পেতে শুরু করল। কয়েকপা এগিয়ে একসঙ্গে অসংখ্য গজারী গাছ দেখতে পেলাম। সেখান থেকে ভেসে আসছে পাখিদের জোরালো কিচির-মিচির। সামনে এগিয়ে দেখি গাছগুলোর ডালে ডালে দলে দলে চড়ুই পাখির ঝাঁক। মনে হল গোটা গাঁয়ের সব চড়ুই পাখি যেন এখানে জোট বেঁধেছে। কিচির-মিচির শব্দে কান ঝালাপালা করা অবস্থা। এরপর হাঁটতে হাঁটতে যেখানে গিয়ে থামলাম জোয়ারের পানি পথ ছুঁই-ছুঁই। আরেকটু সামনে কদম ফেললে আমার পা ভিজে যায় পানিতে। তাকিয়ে দেখি, কচুরীপানার ভেলা ভেসে যাচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা-বক মাছ খুঁজছে, আবার কোনটি মাছ পেয়ে উড়াল দিয়ে চম্পট হচ্ছে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য মন ভালো করে দেয় নিমেষেই। এসব কিছুর মাঝেই কাটালাম পাঁচদিন। 
গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোকে ছেড়ে ব্যস্ত শহরে যখন ফিরব বিদায়বেলায় নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল এসেছিল।

Thursday, August 20, 2015

ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লায় কিছু সময়

ফেসবুকের 'আনলিমিটেড আড্ডা' নামক গ্রুপ আড্ডা জমাতে গিয়েছিল লালবাগ কেল্লায় ফিরে এসে লিখেছেন রফিকুল ইসলাম সাগর 

অনেক ছোট থাকতে একবার লালবাগ কেল্লায় গিয়েছিলাম। অনেক বছর আগের কথা ঠিক মনে ছিল না মহাখালী থেকে লালবাগ কেল্লায় যাওয়ার সহজ পথ কোনটা। এক বড় ভাইয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী মহাখালী থেকে ৩ নম্বর বাসে উঠে শাহবাগ পর্যন্ত যাই। শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার রাস্তায় এক রিকশা চালককে বললাম, মামা লালবাগের কেল্লায় যাইবেন? যামু। কত? ৬০ টাকা। ৩০ টাকা দিমু। নাহ যামু না!

অন্য আরেকটি রিকশাচালককে বললাম। সে ৪০ টাকার কমে যাবেন না। এ রিকশাতেও উঠলাম না। আরেক জনকে বললাম। ৪০ টাকা ভাড়া চাইল। আমি বললাম, ৩০ টাকা। পরে ৩৫ টাকায় রিকশা ভাড়া করলাম। ঘড়ির কাটায় বিকেল ৩টা বেজে ৩০ মিনিট। যানজটহীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে রিকশা চলছে। আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে পারিপার্শিক দৃশ্য আর ভিন্ন ভিন্ন মানুষ দেখছিলাম। রোদ মুক্ত ঠা-া পরিবেশ। মানুষের হইচই আর রিকশার ক্রিং ক্রিং হর্নের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। লালবাগ এলাকায় কেল্লার কাছাকাছি এসে ছোট রাস্তায় একটু জ্যামে আটকা পরি। পথচারি আর ছোট বড় গাড়ি মিলিয়ে লম্বা জ্যাম। দলে দলে মানুষ নানা সাজে সেজে কেল্লার পথে হেটে যাচ্ছে। সবার মুখে আনন্দের হাসি। চোখে দেখার আগ্রহ। দেখে বোঝা যাচ্ছিল এ মানুষগুলো লালবাগ কেল্লার দর্শনার্থী। জ্যাম ঠেলে রিকশা লালবাগ কেল্লার সামনের রাস্তায় পৌঁছল। সীমানার দেয়াল ঘেষে ছোট রাস্তা। বুঝতে পারলাম একটু সামনেই লালবাগ কেল্লা। বা পাশে অনেক উঁচু কেল্লার সীমানার দেয়াল। দেয়ালের উচ্চতা যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে আরও একটু লোহার শিক মিলিয়ে উচ্চতা। দেয়াল টপকে ভিতরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। কেল্লার মোট তিনটি গেট। সামনের দিকে দুইটি পেছনে একটি। লোহার বিশাল বড় এবং মজবুত রাজকীয় গেট ঘাড় উঁচু করে দেখতে হবে। দুইটি গেট সব সময় বন্ধ করে রাখা হয়। একটি গেট ব্যবহার হয় সকলের প্রবেশ এবং বাহির হওয়ার জন্য। এরই মধ্যে রিকশা মূল গেটের সামনে পৌঁছল। টিকিট কাউন্টারের সামনে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। মানুষের পেছন থেকে এক পা দু পা এগিয়ে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে ভেতরে প্রবেশ করি।

ভেতরে প্রবেশ করেই সামনের দিকে বিবি পরীর সমাধি সৌধ দেখতে পেলাম। সামনের দিকে না এগিয়ে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম দর্শনার্থীদের চলাচল করার পথ, ভেতরের খোলা মাঠ সব কিছু খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য পথের দুই পাশে আকর্ষণীয় ফুলের গাছ। মাঠের ঘাসগুলো সবুজ সতেজ। ঘাসেও বিভিন্ন ডিজাইন করে ফুলের গাছ। শিশু, তরুণ ও বৃদ্ধ সব বয়সের দর্শনার্থী মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছে, কেউ মাঠে বসে আড্ডা জমিয়েছে আবার কেউ কাউকে খুঁজছে। এদিক থেকে আমি কিছু ছবি তুলেনিলাম। সোজা সামনের পথে এগিয়ে গিয়ে দেখা হয় আনাস বিল্লাহ, আতাউর রহমান ও গাজী খায়রুল আলমের সঙ্গে। আড্ডা জমাতে ওরা আগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। আমরা ক'জন মিলে একে একে সব কিছু ঘুরে দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমাদের সঙ্গে যোগ হয় আরও দুইজন সমুদ্র বিপ্লব ও সাইমুন সাদ। পেছন দিকটায় ছোট একটি লোহার গেটের সামনে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখতে পেয়ে এগিয়ে যাই সেখানে। এটি কেল্লার সুরঙ্গ পথ। এই পথ দিয়ে নাকি বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে যাওয়ার গোপন রাস্তা। তবে এখন আর এই পথ ব্যবহার করার সাহস কেউ করে না। এখান দিয়ে গেলে নাকি আর ফিরে আসা যায় না। কেউ যেন যাওয়ার চেষ্টা না করে তাই গেটে বড় আকারের তালা ঝোলানো। গেটের এপাশে দাঁড়িয়ে সুরঙ্গের ভেতরের দিকে উঁকি দিলে অন্ধকারে নিচের দিক নামানো ক'টি সিড়ি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। এটা দেখতেই মানুষের এতো কৌতুহল। এখানে দাঁড়িয়েই মূলত সবাই এই সুরঙ্গের ইতিহাস বলাবলি করে। ছোট শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছে জানতে চায় এর ইতিহাস। এখান থেকে পশ্চিম পাশের মসজিদটি এক নজর দেখে এলাম। ভেতরে যাইনি। বাইরে থেকেই দেখলাম। কেল্লার পেছনে দক্ষিণ দিকে তিনটি গেটের আরেকটি গেট। এটিও এখন আর ব্যবহার হয় না। এই গেটটিই আমার চোখে সব চেয়ে সুন্দর মনে হয়েছে। এখনকার সময়ের নির্মাণ আর সেই আমলের নির্মাণ দেখে অবাক হতেই হয়। কত সূক্ষ্ম, প্রসংশনীয় পরিকল্পনা, দক্ষ কাজ ও মজবুত নির্মাণ। পূর্বপাশে গিয়ে একটি পুকুর দেখতে পাই। এটিতে একটু পানিও নেই। উপর থেকে নিচের গভীরতা দেখা যায়। ঘড়ির কাটায় বিকেল ৫টা। চারিদিক থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দর্শনার্থীদের থাকার সময় শেষ। লালবাগ কেল্লার নিরাপত্তাকর্মীরা বাঁশি ফু দিয়ে দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন। হাত দিয়ে ইশারা করে সবাইকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। খুব অল্প সময় তাই এখানে আর আড্ডায় বসা গেল না। তবে আমরা ঠিক করলাম আরেকদিন লালবাগ কেল্লায় আড্ডা করব। সেদিন সকাল সকাল চলে আসব। সবার সঙ্গে আমরাও একে একে বের হয়ে যাই। লালবাগ কেল্লা নিয়ে এই পর্যন্ত অনেক লেখা পড়েছি। একটু একটু করে জেনেছি। মোগল আমলে বাংলায় নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লাটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরাকীর্তি। সতেরো শতকে বাংলায় মোগল শাসকদের শাসন মনোভাব, স্থাপত্য বিকাশের ঐতিহাসিক ক্ষেত্র এই লালবাগ কেল্লা।

ইতিহাসের পাতায় লালবাগ কেল্লার রূপকার হিসেবে শায়েস্তা খানের নাম পাওয়া গেলেও শায়েস্তা খান মূলত এই স্থাপনা নির্মাণকার্য শুরু করেননি। এটির নির্মাণের স্বপ্ন এবং সূচনা ঘটেছিল মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ আযম শাহের হাত ধরে। আযম শাহ ১৬৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত মাত্র এক বছর বাংলার সুবাদার ছিলেন। এই সময়টাতে তিনি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী স্থানে তার পিতার নামানুসারে একটি স্থাপনা নির্মাণের কাজে হাত দেন। যার প্রথম নাম আওরঙ্গবাদ কিল্লা হলে পরবর্তীকালে লালবাগ কেল্লা নামে পরিণত হয়ে যায়। সুবাদার আযম শাহ লালবাগ কেল্লা নির্মাণ শুরু করলেও দিলি্ল থেকে জরুরি তলব আসায় ঢাকায় তিনি আর অবস্থান করতে পারেননি। তখন থমকে যায় লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কার্যটিও। তার অবর্তমানে ঢাকায় প্রেরিত নতুন সুবাদার শায়েস্তাখানকে তিনি আওরঙ্গবাদ কিল্লাটির অসম্পূর্ণ কার্য সম্পূর্ণ করার অনুরোধ করেন। শায়েস্তাখান আপন জামাতার এই নির্দেশনাকে বাস্তবায়ন করতে পারেননি তার বিশেষ পারিবারিক কারণে। এর পেছনে কয়েক ধরনের রটনা আছে। অনেকের মতে, এই আওরঙ্গবাদ কিল্লা বা লালবাগ কেল্লা নির্মাণের সময় শায়েস্তাখান তার কন্যা ইরান দুখতকে হারান। যিনি ছিলেন কেল্লা নির্মাণের প্রথম রূপকার আযম শাহের স্ত্রী। এ কারণেই শায়েস্তা খানের মনে বিশ্বাস জাগে কেল্লাটি একটি অপয়া স্থাপনা। সুতরাং তিনি অসম্পূর্ণ দুর্গটি নির্মাণে আর বেশিদূর অগ্রসর হননি। দুর্গ নির্মাণে শায়েস্তা খানের নিদারুণ অনাগ্রহ পর্যবেক্ষিত হলেও আপন কন্যা ইরান দুখতের মাজারকে তিনি দর্শনীয় স্থাপনা বানিয়ে তোলেন। মাজারটি নির্মাণের লক্ষ্যে শায়েস্তা খান ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাদা মার্বেল, ব্যাসল্ট, বেলে পাথরসহ আরও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ উপকরণ এনেছিলেন। আর এগুলোর সমন্বয়করণেই তৈরি হয়েছিল লালবাগ কেল্লার অন্যতম দর্শনীয় বিবি পরী বা ইরান দুখতের মাজারটি। এই মাজার ছাড়াও লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে রয়েছে গোসলখানা, একটি মসজিদ, পুকুর আর বাগান। পুরো বাংলার শাসনক্ষমতা মোগল সম্রাটের অধীনস্থ থাকলেও সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানের মেয়ের স্মৃতিস্বরূপ লালবাগ কেল্লাটিকে শায়েস্তাখানকে দান করে দেন। শায়েস্তাখানের পরবর্তী বংশধরেরা কেল্লাটিকে সরকারের কাছে লিজ দিয়ে বার্ষিক ৬০ টাকা করে পেতেন। পুরানা পল্টন থেকে ১৮৫৩ সালে সেনানিবাস পরিবর্তন করে এই লালবাগ কেল্লায় নিয়ে আসা হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের ক্ষেত্রেও এই কেল্লাটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে কেল্লাটিকে একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এখতিয়ারে আছে। লালবাগ কেল্লায় প্রবেশ টিকিট মূল্য ১০ টাকা (বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য) ১০০ টাকা (বিদেশি নাগরিকদের জন্য)। 

লালবাগ কেল্লার গ্রীষ্মকালীন (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) সময় সূচি হলো_ সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যস্ত। আর শীতকালীন (অক্টোবর থেকে মার্চ) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। মাঝে ১ টা থেকে ত্রিশ মিনিটের মাধ্যাহ্ন বিরতি। শুক্রবারে মধ্যাহ্ন বিরতি থাকে ১২টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা ৩০ মিটিন পর্যন্ত। রোববার পূর্ণ দিবস, সোমবার অর্ধদিবস এবং সব সরকারি ছুটির দিনগুলোতে লালবাগ দুর্গ বন্ধ থাকে। 

লালবাগ কেল্লা থেকে বের হয়ে আমরা ঠিক করলাম কিছুক্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সময় কাটাব। কোন রিকশা সেই পথে যেতে রাজি না হওয়ায় আমরা হাটা শুরু করি। প্রায় পনের মিনিট হাটার পর সমুদ্র বিপ্লব আমাকে প্রশ্ন করল, এটা কোন জায়গা? আজিমপুর! আমি উত্তর দিলাম। বিপ্লব আবার বলল, ইডেন কলেজটা কোন দিকে? আনাস বিল্লাহ হাত উচিয়ে সামনের দিকে দেখিয়ে বলল, ওদিকে। ইডেন কলেজ অতিক্রম করে নিউমার্কেটের কাছে এসে বিপ্লব বলল, এবার সব চিনতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে পৌঁছতে আমাদের সময় লাগলো প্রায় এক ঘণ্টা। রাত ৯টার কাছাকাছি সময়ে এসে আড্ডা শেষ করি। তারপর যার যার নীড়ে ফেরা। 

Saturday, August 8, 2015

যান্ত্রিক নগর ছেড়ে...

রফিকুল ইসলাম সাগর

ভ্রমণের মাঝে লুকিয়ে থাকে নানা অভিজ্ঞতার কথা। অনেকেরই নানা দেশ-স্থান ভ্রমণের আগ্রহ থাকলেও আমার আগ্রহটা অন্যরকম। নতুন দেশ, জায়গা তো বটেই তার চেয়ে বেশি উপভোগ করি এর যাত্রাটা। তাও আবার ট্রেনে।
অন্য সব যানবাহনে ভ্রমণের চেয়ে ট্রেন ভ্রমণের মজাটা অন্যরকম। দেশে এবং বিদেশে অসংখ্যবার ট্রেনে উঠেছি। একেক দেশে ট্রেনের একেক নাম। ট্রেনেগুলোর আকারও একেক রকম। আর এর নামগুলো মূলত সেসব দেশের স্থানীয় ভাষায় হয়।
আমার জীবনের স্মৃতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে ট্রেন ভ্রমণের স্মৃতি। ট্রেনের ঝকঝক শব্দ, যানজট বিহীন পথ। ট্রেন লাইনের দু'পাশে সারি সারি গাছ। যেনো আশপাশের বাড়িঘর সব কিছুকে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন তার আপন গন্তব্যে।
ছোটবেলা থেকেই আমার ভ্রমণের নেশা। কোথাও ভ্রমণে যেতে ট্রেনকে বেছে নেই সবার আগে। ট্রেন ভ্রমণের অসংখ্য অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে ঘটেছে অনেক ট্রেন দুর্ঘটনা। সময় মতো গন্তব্যে না পৌঁছানোর কারণে অনেক রাত কাটিয়েছি রেল স্টেশনে। এছাড়া ট্রেনের সময়সূচি বিলম্ব হওয়ার কারণেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে রেল স্টেশনে।
এবার আমাদের গন্তব্য ছিলো গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে। শরীফ ভাই আগের দিন বলে রেখেছিল শ্রীপুর যাওয়ার কথা। পরের দিন দুপুরে শরীফ ভাই ফোন করে বলল, বিকেল সাড়ে চারটায় ট্রেন। তিনটের মধ্যে আমাদের স্টেশনে যাওয়ার জন্য বের হতে হবে। যথাসময়ে বিমান বন্দর স্টেশনে পৌঁছলাম।
স্টেশনে অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি ভিড়। মে দিবস এবং দুইদিন সরকারি ছুটি মিলিয়ে একসাথে তিনদিন ছুটি পেয়ে সবাই নিজ নিজ গাঁয়ে ফিরছে। সবার চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। এ আনন্দ আপন মানুষদের সাথে মিলিত হওয়ার।
কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে ট্রেনের জন্য দশ মিনিট অপেক্ষা করতেই মাইকে ঘোষণা শুনতে পেলাম, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দেওয়ানগঞ্জগামী জামালপুর কমিউটার স্টেশনে আসবে। মাইকে ঘোষণা শুনতে পেয়ে ট্রেনে ওঠার প্রস্তুতি নিলাম। কয়েক মিনিট পর জামালপুর কমিউটার স্টেশনে দাঁড়ালো।
ট্রেনের প্রতিটি বগিতে যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় দেখতে পেলাম। এই ভিড়ের ভেতরেই আরও যাত্রী ঠাসাঠাসি করে ট্রেনে উঠছে। শরীফ ভাই আমাকে বলল, কিরে কি করবি? কিভাবে যাবি? আমি বললাম, চলো ছাদে উঠি। শরীফ ভাই প্রথমে আপত্তি করলো। পরে দু'জনেই ট্রেনের ছাদের উপর উঠলাম। ছাদের উপরেও জায়গা নেই। কোনরকম চাপাচাপি করে বসলাম।
এই ভিড়ের মধ্যেই ছাদের উপর হকাররা নানা রকমের খাবার বিক্রি করছে। কেউ ডিম, কেউ পান-সিগারেট, কেউ চানাচুর-সিঙ্গারা। হকারগুলো চলন্ত ট্রেনেই ছাদের উপর হেঁটে এক বগি থেকে অন্য বগি লাফিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটার বিন্দুমাত্র ভয় নেই তাদের। ছাদের উপরেও একজন এলো টিকেট চেক করতে।
এয়ারপোর্ট স্টেশনের পর টঙ্গী, এরপর জয়দেবপুর ক্রস করে ভাওয়াল স্টেশন। ভাওয়াল অতিক্রম করার পরই চলন্ত ট্রেন থেকে বাম দিকে গায়ের খোলা মাঠে মেলা দেখতে পেলাম। ক্ষণিকের দৃষ্টিতে রঙিন পোশাকে ছোট বড় অনেক মানুষ মেলায়।
সব স্টেশনের চেহারাই কেমন যেনো এক মনে হয় আমার কাছে। তবে দেশের বাইরের রেল স্টেশনগুলোতে আমাদের দেশের মতো চা স্টল নেই। এছাড়া সেসব রেল স্টেশনগুলো অনেক পরিষ্কার পরিছন্ন। পাশাপাশি টিকেটিং সিস্টেমও অনেক উন্নত। সব কিছু অটোমেটিক ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে হয়। যে কারণে বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণের কোনো সুযোগ নেই। রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুক্ষণ পরপর চায়ের দোকানে গিয়ে চা পান করা, প্ল্যাটফর্মে বসে বসে অপেক্ষা করা, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, নানা রকমের ঘটনা সেই মুহূর্তগুলো ছিল আমার জীবনের ভালো কিছু মুহূর্ত। ট্রেন স্টেশন ও পার্শ্ববর্তী দৃশ্যগুলোতে যেনো ডুবে যাই আমি।
ঝক ঝক শব্দে ট্রেন চলছে। রেল লাইনের দু'পাশে সারি সারি গাছ। কখনো কখনো গাছের ডাল-পাতা শরীরে আঘাত লাগার আশঙ্কায় মাথা উঁচু-নিঁচু করতে করতে রাজেন্দ্রপুর স্টেশন অতিক্রম করলাম। এ রাস্তায় লাইনের দু'পাশে গাছের সংখ্যা আরো বেশি। একটু দূরে ঘন গজারী বন। বনের ভিতরে ইটের রাস্তা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। তারকাটার বেড়া দিয়ে বনগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। কখনো আবার লাইনের দু'পাশে কলা বাগান, বাঁশ বাগান। কোথাও আবার খালি ময়দান, ধানক্ষেত, পুকুর এসব দৃশ্য হৃদয় বন্দী করে পৌঁছে গেলাম শ্রীপুর স্টেশনে।
ট্রেন থেকে নেমে আমি খুব আফসোস করলাম অনেক দ্রুত চলে এলাম বলে। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের আনন্দটা একেবারে অন্যরকম। এডভেঞ্চারে ভরপুর।
শ্রীপুর স্টেশনের বাজারে একটি চায়ের দোকানে হাতমুখ ধুয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। গরুর দুধের চা। শরীফ ভাই বলল, এখান থেকে বেশি কিছু খাবি না! সামনে গিয়ে তোকে একটি হোটেলে পুরি খাওয়াব। এমন মজাদার পুরি তুই আর কোথাও পাবি না।
পুরি খেয়ে বুঝলাম শরীফ ভাই এই পুরির এতো সুনাম কেন করলেন। এমন পুরি আসলেই অন্য কোথাও খাইনি আমি, এর ভেতরের মসলা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার শুধু পুরি-ই না পিয়াজু ও আলুর চপও মজাদার।
ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন জীবনের প্রথম স্কুল ফাঁকি দিয়ে দু'জন বন্ধু ট্রেনে করে চলে গিয়েছিলাম ঘোড়াশাল রেল স্টেশনে, তখন থেকে ট্রেন ভ্রমণের নেশা আমাকে জেঁকে ধরে। তারপর থেকে আর থেমে নেই। যখন-তখনই অনির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যেতাম ট্রেনে করে। স্টেশনে গিয়ে সময় সূচি দেখতাম। স্টেশন পৌঁছানোর পর কাছিকাছি সময়ে যেই ট্রেন আসতো সেই ট্রেনেই উঠে পরতাম।
ছোটবেলায়ও ট্রেন ভ্রমণ করেছি, তবে বাবা-মায়ের সাথে। আগে ট্রেনে ভ্রমণ করতাম প্রয়োজনে। আর এর পর থেকে ভ্রমণ করাটা নেশায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি রেলস্টেশন আমার পরিচিত, প্রায় রেলের সব তথ্যই আমার জানা। এমন অনেকবার হয়েছে, সকালের ট্রেনে যেতাম আবার রাতে আরেক ট্রেনে ফিরে আসতাম। মূল উদ্দেশ্যই ছিল শুধু ট্রেনে ওঠা।
দিনের চেয়ে রাতে ট্রেন ভ্রমণটা বেশি উপভোগ্য। আর যদি রাতটা চাঁদনি রাত হয় তো কথাই নেই। আধো রূপালি আলোয় একটার পর একটা দৃশ্য ছুটে যায়, পেছনের দিকে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যপটের বদল হয়।
মনটা কেমর যেনো খুব অদ্ভূত ভাবে আবেগি হয়ে যায়। নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা হয় তখন। সব কিছুই দেখা যায়, আবার ভালো করে দেখতে গেলে কোনো কিছুই ঠিকমতো দেখা যায় না। কেবল কল্পনায় আবিষ্কারের চেষ্টা ওখানে কী ‌আছে।
ভ্রমণে গিয়ে পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেলে বাড়ি ফেরা নিয়ে ভয় পেতাম না। ট্রেনে টিকেট ছাড়া, ভাড়া ছাড়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও আমার নেহাত মন্দ নয়।
স্কুলে পড়াকালীন আমি বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ট্রেনে করে দূর দূরান্তে চলে যেতাম। তখন ট্রেনের ছাদে বসে যেতে আমার বেশি ভালো লাগতো। তাই নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকেট কিনেও লোকাল ট্রেনের ছাদে বসে যেতাম। এখন আর ছাদে বসে যাওয়ার মতো পাগলামি তেমন একটা করা হয় না।
যা হোক, আমরা রাত যাপন করলাম শরীফ ভাইয়ের ফুফুর বাড়িতে। রাতে প্রচণ্ড রকমের ঝড় এবং তার সাথে বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ সাথে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ঘুম ভালো হয়েছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষে গেলাম তাঁতিসুতা গায়ে। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা ১১টা। নতুন বাজার থেকে হেঁটে গাঁয়ের পথে ধরলাম। মাটির কাঁচা পথ। একটু সামনের দিকে যেতেই দু’পাশে দিগন্ত প্রসারী ঘন সবুজ ফসলের মাঠ। দক্ষিণা বাতাসে দোল খায় সোনালী ধান ক্ষেত।
কিছু কিছু ধান গাছ ঝড়ের আঘাতে শুয়ে গেছে। আরেকটু সামনে দেখতে পেলাম কৃষকেরা ধানের আটি থেকে ধান ঝাড়ছে। ততক্ষণে শরীফ ভাইদের গাঁয়ের বাড়িতে চলে এসেছি। বাড়ির একটু আগে পথে ছোট ছোট দুই-তিনটা আমগাছ চোখে পড়ল। যেগুলোতে আম ঝুলছে। বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম উঠানে ধান শুকাতে দেওয়া। সবগুলো মাটির ঘর। বাড়ির চারপাশ আম, কাঁঠাল, আমড়া, তাল, খেঁজুর গাছের ছায়ায় ঘেরা। আম গাছে আম, কাঠাল গাছে কাঁঠাল, খেজুর গাছে খেজুর, তাল গাছে ছোট ছোট তালের আঁটি ঝুলছে।
কাঁচা আম পাড়তে বাড়ির পিছনে গেলাম। শরীফ ভাই বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে আম ফেলল আর আমি কুঁড়ালাম। আম পাড়া শেষে আমাদের বেল পাড়া কর্মসূচি। গাছে ওঠার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কাঁটার জন্য উঠতে পারলাম না। অবশেষে অনেকক্ষণ চেষ্টা করে শরীফ ভাই বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে বেল পাড়তে লাগলেন।
এবার দু’জনে দা’ হাতে নিয়ে নারিকেল বাগানে গেলাম। সেখানে গিয়ে পেলাম শরীফ ভাইয়ের চাচাতো ভাই ফরহাদকে। নারিকেল বাগানে নারিকেল গাছের পাশাপাশি আমের গাছও দেখা গেল। আমি ছোট একটি নারিকেল গাছে উঠলাম। কিন্তু ডাব পারতে পারলাম না। উপরে উঠেই শরীরে ক্লান্তি অনুভব করে নেমে পড়লাম। পরে ফরহাদ ছয়টা ডাব পারলো।
নারকেল বাগানের ছায়ায় বসলাম কিছুক্ষণ, পাখিদের কিচির-মিচির, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বাতাস মনে চরম শান্তি অনুভব করলাম। দুপুরে খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম শেষে এবার আবার যান্ত্রিক নগরে ফেরার পালা। এমন শান্ত-শ্যামল পরিবেশ ছেড়ে যদিও ফিরতে চাইছিল না মন তারপরেও...।



Tuesday, June 30, 2015

একটি ছবির গল্প

বাস্তবে টাইটানিক জাহাজ দেখার গল্প 

১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হলিউডের অসাধারণ সিনেমা 'টাইটানিক' এর কথা তো সবার মনে আছে? সিনেমাটির মূল কাহিনী একটি জাহাজকে নিয়ে। যে জাহাজটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজ। জাহাজটি নির্মাণকারীরা দাবি করেছিলেন এটি কখনো ডুববে না। কিন্তু জাহাজটি প্রথমবার যখন সমুদ্রে ভেসেছিল সেবারই ডুবে গিয়েছিল। তা আজ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩ শ’ বছর পূর্বের কথা।  
টাইটানিক সিনেমার শ্যুটিং করা হয়েছে রাশিয়ার মির অভিযানের সহযোগী জাহাজ Akademik Mstislav Keldysh-এ, আর প্রাচীন টাইটানিকের শ্যুটিংয়ের জন্য পুরনো টাইটানিক নতুন করে তৈরি করা হয়। বাহা ক্যালিফোর্নিয়ার Playas de Rosarito-তে টাইটানিক পুনর্নির্মাণ করা হয়। এছাড়া টাইটানিকডুবির দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য ক্যামেরন স্কেল মডেলিং ও কম্পিউটার এনিমেশনের সাহায্য নেয়া হয়। 

এতক্ষণ বললাম, টাইটানিক সিনেমা ও সিনেমায় দেখানো জাহাজটির কথা। এবার বলছি, বাস্তবে আমার দেখা একটি টাইটানিকের মতো জাহাজ দেখার গল্প। 
গিয়েছিলাম মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপে। সঙ্গে ছিল চার বন্ধু। এক দুপুরের কথা। আমাদের সাথে ছিল ভাড়া করা মোটরসাইকেল। পান্তাই চেনাং নামক সমুদ্র বিচে গেলাম। তার একটু পরেই চোখের সামনে দিয়ে সমুদ্রে ভেসে যেতে দেখি বিশাল বড় একটি যাত্রীবাহী জাহাজ। তাকিয়ে থাকি, যেতে যেতে হটাত জাহাজটি দৃষ্টি থেকে হারিয়ে যায়। আর তখনই আমাদের সবার মাথায় ভূত চেপে বসে জাহাজটিকে আরেক নজর দেখবার জন্য। মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটতে থাকি সমুদ্রের পাশ ঘেষে যাওয়া রাস্তায়। খুজতে খুজতে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাই জাহাজটির সন্ধান। কাস্টমস গেইটের সামনে জাহাজটি থেমেছে। দাড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি জাহাজটির দিকে। এতো বড় যাত্রীবাহী জাহাজ বাস্তবে এর আগে কোনদিন দেখিনি। তাই অবাক না হয়ে পারিনি। গুনলাম, জাহাজটি সাত তলা। জানতে পারি এটি ফাইভ ষ্টার মানের জাহাজ। সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়া যাত্রীবাহী জাহাজ। এর ভেতরে সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট, কেসিনো, বার, ডিসকো, সুইমিং পুলসহ বিনোদনের সব আয়োজন আছে।  

লেখা ও ছবি : রফিকুল ইসলাম সাগর 

Monday, June 15, 2015

মহাস্থানগড়ে একদিন

 ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২, বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

Wednesday, June 10, 2015

যেন ইউরোপের কোনো দেশ

রফিকুল ইসলাম সাগর

আমি মালয়েশিয়ার প্রায় প্রতিটি দর্শনীয় স্থান ঘুরেছি। এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত গিয়েছি। বলা যায় মালয়েশিয়ার পর্যটন আকর্ষনীয় যত জায়গা আছে সব স্থানে গিয়েছি। কখনো বিমানে, কখনো বাসে কখনো বা জাহাজে। সেখানকার ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভালো খারাপ মিলিয়ে নানান রকমের মানুষের সাথে মিশেছি, কথা বলেছি, দিন যাপন করেছি। হয়েছে অনেক অভিজ্ঞতা। বাস্তব জীবন যে কত কঠিন তা আমি মালয়েশিয়া না আসলে বুঝতে পারতাম না। আমার পুরো জীবনটাই পাল্টে গিয়েছে, শিখেছি অনেক কিছু। একটা কথা বলতেই হয় আমাদের দেশে আমাদের বাবা-মা আমাদের যেমন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ায় প্রবাসে এমনটি হয় না। সেখানে সবাইকে পরিশ্রম করে চলতে হয়। কিছু কিছু দিক বিবেচনা করলে আমাদের সোনার বাংলাদেশ কথায় না কাজেও সোনার বাংলাদেশ।
মালয়েশিয়ার গোটা দেশ জুড়ে পাহাড়। এশিয়ার একটি দেশ হলেও কিছু কিছু জায়গায় গেলে মনে হয় ইউরোপের কোনো দেশ। যেমন বুকিট বিনতাং, গ্যান্তিং হাইল্যান্ড ও লাংকাউই। মালয়েশিয়ানদের সবচেয়ে প্রিয় ঘুরে বেড়ানো,শপিং করা ও সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। বন্ধের দিন অথবা কাজ শেষ করে নিজ গাড়িতে করে তারা ঘুরতে চলে যায় নিজ গ্রামে অথবা দূরে কোথাও। মালয়েশিয়ায় জিরো ডাউনপেমেন্টে ও দীর্ঘমেয়াদী সহজ কিস্তিতে গাড়ি কেনা যায় বলে সবার গাড়ি এবং মটর সাইকেল আছে। এখানকার মটর সাইকেল দেখতে আমাদের দেশের মটর সাইকেলের মত না। দেখতে আমাদের দেশে চলিত লেডিস স্কুটির মত। মটর সাইকেল গুলোর গতি ১০০ সিসি থেকে ১৫০০ সিসি পর্যন্ত। অবাক লাগে যখন দেখি বৃদ্ধ বয়সের নারী মটর সাইকেল অথবা সাইকেল চালাচ্ছেন। আমাদের দেশের নানী দাদী বয়সের নারীরাও কঠিন পরিশ্রম করে। প্রতিটি সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে নারীদের সংখ্যাই বেশি। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ কোটা থাকায় প্রতিটি সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যাও চোখে পড়ার মত। এছাড়া প্রতিবন্ধীরা সরকার থেকে আর্থিক সহযোগিতা সহ নানান রকমের সুযোগ-সুবিধা পায়। মালয়েশিয়ানরা নিজ ঘরে রান্না করে খাওয়ার চেয়ে বাইরে রেস্টুরেন্টেই খাবার খায় বেশি। বেশির ভাগ মানুষ তিন বেলা বাইরে থেকে খাবার কিনে খায়। তাই এখানকার সব চেয়ে লাভজনক ব্যবসা খাবারের ব্যবসা। মালয়েশিয়ার অলিতে গলিতে খাবারের দোকান/রেস্টুরেন্ট। কাজ শেষে নারী পুরুষ উভয়কে মধ্যরাত পর্যন্ত খাবারের দোকান গুলোতে আড্ডা দিতে দেখা যায়। অধিকাংশ খাবারের দোকান ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে। সব গুলো খাবার দোকান/রেস্টুরেন্টে প্রজেক্টর নয়তো বড় পর্দার টিভি আছে। ফুটবল এদেশের মানুষের সব চেয়ে প্রিয় খেলা। ক্রিকেট খেলার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। ফুটবলের বড় বড় ম্যাচ গুলোতে খাবারের দোকান/রেস্টুরেন্টে সবচেয়ে বেশি ভীর থাকে। প্রজেক্টর অথবা বড় পর্দার টিভিতে তারা খেলা দেখে হই চৈ করে সাথে কেউ কেউ আতশ বাজি করে,পটকা ফুটায়।
শপিংমলের সংখ্যা মালয়েশিয়ায় অনেক। শুধু ছুটির দিন নয় সপ্তাহের প্রতিটিদিন শপিংমলে ভীর থাকে। প্রতিটি শপিংমলে সিনেমা হল আছে। মালয়েশিয়ানরা মালাই সিনেমার চেয়ে ইংলিশ সিনেমাই দেখে বেশি। তারা মূলত ভুতের সিনেমা, এনিম্যাশন সিনেমা বেশি পছন্দ করে। এছাড়া তারা হিন্দী সিনেমাও দেখে। তবে তারা হিন্দী খুব একটা বুঝে না। ইংলিশ সাবটাইটেল দেখে বুঝে নেয়। অনেকের মুখে হিন্দী গান শুনি। বিশেষ করে শাহরূখ খানের সিনেমার গান। শাহরূখ খান তাদের অনেক পছন্দের নায়ক। মালাই সিনেমা গুলো বেশিরভাগই ভুতের কাহিনী। এছাড়া প্রেমের সিনেমা ও কমেডি সিনেমাও নির্মাণ হয়। তবে ভুতের সিনেমাই বেশি জনপ্রিয়। তাদের মিডিয়া খুব একটা উন্নত না। নাটক, সিনেমা, সংবাদ কোনো কিছুরই খুব বেশি সুনাম নেই। মালয়েশিয়ার মিডিয়ার চেয়ে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের মিডিয়া উন্নত। মালয়েশিয়ানদের দাবি তাদের সিনেমায় খুব বেশি টাকা খরচ করা হয় না যেই কারণে তাদের সিনেমা ভালো হয় না। প্রায় বছর খানেক আগে মালয়েশিয়ার যেই বাড়িটিতে থাকি তার সামনের প্রধান সড়কে দুই সন্ত্রাসীকে পুলিশ গুলি করে মেরেছিল। তাদের কাছ থেকে স্নাইপার নামক একটি পিস্তল পাওয়া গিয়েছিল বলে সাথে সাথে গুলি করা হয়। দুই সন্ত্রাসী মারা যায়। ক`য়েক মিনিটে আরো অনেক পুলিশের গাড়ি এসে রাস্তাটি ব্লক করে দেয়। হই চৈ শুনে রাস্তায় বের হয়ে দেখতে পাই নতুন এই দৃশ্য। কিন্তু কাছে যাওয়ার কারো অনুমুতি নেই। পুলিশ লাইন লেখা সীমানার বাইরে দাড়িয়ে সবাই এই দৃশ্য দেখছে। লাশ দেখতে পাইনি। শুধু দূর থেকে দেখেছিলাম একটি সাদা গাড়ি যেই গাড়িটির ভিতরেই দুই সন্ত্রাসীকে গুলি করা হয়েছে। সেখানে অনেক পুলিশ। সাংবাদিকরাও সংবাদ সংগ্রহ করতে এসে আমাদের সাথে দাড়িয়ে ছিল। তাদেরও কাছে যাওয়ার অনুমুতি নেই। দূর থেকে দাড়িয়ে সাংবাদিকরা ছবি তুলছিল ভিডিও চিত্র ধারণ করছিল। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির লাশের ছবি ও ভিডিও চিত্র মালয়েশিয়ার মিডিয়াতে প্রকাশ হয় না। শুধু সংবাদ প্রকাশ হয়। টিভিতে সংবাদে যে ভিডিও চিত্রটি দেখানো হয়েছিল সেখানে পুলিশ আর পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।
মালয়শিয়ার আইন কঠিন তারপরেও এখানে অপরাধ হয় না বললে ভুল হবে। তবে ভয়ংকর রকমের অপরাধ যেমন- মানুষ হত্যা হয় না বললেই চলে। ছিনতাই চুরির ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। কিছু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ মহল্লা আছে যেখানে চলতি পথে সতর্ক থাকতে হবে। মটর সাইকেলে করে চলতি পথে স্বর্ণের চেইন হাতে থাকা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় হেলমেট পরা ছিনতাইকারীরা। ছিনিয়ে নেয়ারপর মটর সাইকেলের গতি বাড়িয়ে চলে যায়। কখনো কখনো চলতি পথে একা পেলে মটর সাইকেল থামিয়েও সব কিছু কেড়ে নেয়। তারা অস্র হিসেবে ব্যবহার করে ছুরি-চাকু। ছিনতাই করার জন্য ছিনতাইকারী টার্গেট করে মূলত বিদেশীদের। কারণ মালয়েশিয়ানদের নিকট থেকে ছিনতাই করলে ধরা পরতেই হবে মালয়েশিয়ানরা এমন ঘটনার পর পুলিশের কাছে অভিযোগ করে, আর অভিযোগ করলে অপরাধীকে পুলিশ খুঁজে বের করবেই। কিন্তু বিদেশীরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না 'যা যাওয়ার তা গেছে এমন ভাবে'। বিদেশীদের মধ্যে বাংলাদেশী, নেপালী ও মায়ানমারীদের টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। কখনো তারা বিদেশীদের ঘরে ঢুকেও চুরি করে। বিদেশী হিসেবে বাংলাদেশীরা এইসব ঘটনার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে কোনো বিচার পায় না। উল্টো পুলিশের কাছে গেলে পাসপোর্ট ভিসা ঠিক আছে নাকি চেক করার ভয়। ছিনতাই চুরি এই কাজ গুলো করে মূলত তামিল ও ইন্দোনেশিয়ানরা। এখানে অধিকাংশ তামিলরা জন্মসুত্রে মালয়েশিয়ান। মালয়েশিয়া অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে তারাই সবচেয়ে বেশি জড়িত। তামিল যারা ভালো  তারা অনেক ভালো। এছাড়া নাইজেরিয়ান, লিবিয়ান, আফ্গানিস্থানী ও পাকিস্থানীরা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। 
চায়না টাউন নতুন-পুরাতন পণ্য কেনা বেচার জন্য মালয়েশিয়ার অতি জনপ্রিয় মার্কেট/বাজার। অনেক বাঙালি একে পাপী পাড়াও বলে থাকেন (এখানে বৈধ-অবৈধ সব কিছু পাওয়া যায় বলে)। চায়না টাউন আমাদের দেশের গুলিস্থান। পুরো বিশ্বে পরিচিত চায়না টাউনে দেশী ক্রেতার চেয়ে বিদেশী ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। সকাল দশটা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কেনা-বেচা চলে। বেশিরভাগ দোকান সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপিয়ান পর্যটকদের আনা গোনা দেখা যায় বেশি। সবচেয়ে কম মূল্যে নতুন-পুরাতন পণ্য কেনা-বেচা হয় এখানে। চায়না টাউনে দোকান গুলো সব ছোট ছোট। এক দোকানের সামনে আরেক দোকান। পোশাক,ব্যাগ,জুতা,শো-পিছ,হাত ঘড়ি,খেলনা ম্যাসাজ সেন্টার সহ আছে সব। প্রয়োজনীয় সব কিছু খুব কম মূল্যে পাওয়া যায়। হয়ত এই কারণেই বিদেশীদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। তবে চায়না টাউনে দামদর করে কিনতে হবে। একটি হাত ঘড়ির দাম চাইবে ২০০ রিঙ্গিত সাহস করে আপনি ২৫ রিঙ্গিত বললে বিক্রেতা কিছুক্ষণ মুলামুলি করে এই দামেই বিক্রি করবে যদি আপনি আরো বেশি দাম না বলেন। চায়না টাউনে অসংখ্য বাঙালি কাজ করে। বলা যায় চায়না টাউন প্রবেশ করলে প্রায় সব দোকানেই বাঙালি। কেউ কেউ নিজেও দোকান বসিয়েছেন। চায়না টাউনে যে সব বাঙালি কাজ করেন তারা খুব ভালই আছেন। বেতন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট। তবে চায়না টাউন পুলিশী ঝামেলা বেশি। সারাদিন পুলিশের আনাগোনা থাকে। ধরপাকর হয় ব্যাপক। অনেক দোকান অবৈধ তাই পুলিশের আগমনে কিছু কিছু দোকানপাট সরিয়ে ফেলতে দেখা যায়। পুলিশ চলে গেলে সব কিছু আগের মত।
মালয়েশিয়াতে যত ভিক্ষুক দেখেছি ১০০ ভাগের মধ্যে ৯০ ভাগ ভিক্ষুক দেখেছি যারা সরাসরি হাত পেতে ভিক্ষা নেয় না। ভিক্ষা নেয় শারীরিক পরিশ্রম করে। এই যেমন চার-পাচ জনের ভিক্ষুক দল সড়কে নানান ধরনের বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে বিনোদন দেয়ার চেষ্টা করছে। কেউ দল ছাড়া একা বাদ্য যন্ত্র বাজাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাদ্য যন্ত্রের সাথে গানও গাইছে। দর্শনার্থীরা যার যত ইচ্ছা খুশি হয়ে তাদের টাকা দিচ্ছে। কোনো কোনো ভিক্ষুক টিস্যু বিক্রি করছে। 

লেখা ও ছবি: রফিকুল ইসলাম সাগর 

২১ আগস্ট ২০১৩, দৈনিক বর্তমানে প্রকাশিত

Tuesday, June 9, 2015

চট্টগ্রাম সিফিল বিচে একরাত

  • রফিকুল ইসলাম সাগর

বন্ধু মহলের আমরা আট জন এক মাস আগে থেকেই প্লান করছিলাম। পাভেল সেখানে পূর্বেই গিয়েছিল। ফিরে এসে পাভেল জায়গাটি সম্পর্কে আমাদের সবাইকে বর্ণনা দিয়ে সবার রাতের ঘুম নষ্ট করেদিয়েছিল। যতক্ষণ বন্ধু মহলে সবাই একসাথে আড্ডা দিতাম আলোচনার বিষয় ছিল চট্টগ্রাম সি ফিল বিচ। রাতে ঘুমাতে গেলে স্বপ্নে সি ফিল বিচে চলে যেতাম। পাভেল আমাদেরসবাইকে জায়গাটি সম্পর্কে অত সুন্দর বর্ণনা করেছিল যে আমরা সবাই রীতিমত মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম যেভাবেই হোক যেতেই হবে। সবাই রাজি। কিন্তু কিভাবে কী হবে। ইচ্ছে থাকলেও সবাই এক সাথে কোথাও যাওয়া হয় না। শেষ মুহূর্তে এসে কেউ না কেউ বাদ পড়ে যায়। এবার সবাই শপথ করলাম এক সাথে যাবই। 
সবাই মিলে দিন-সময় ঠিক করলাম। শেষ মুহুর্তে আমাদের যাত্রা করার নির্ধারিত দিনের দুই দিন আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ওদিকে মিজানের যাওয়ার জন্য টাকা জোগার হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছে আমি আর মিজান যেতে পারব না। ১০৪ ডিগ্রী জ্বর ছিল আমার তারপরেও আগেরদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে আমি সৈকতের হাতে টাকা দিয়ে বললাম আমি যাব সবার সাথে আমার জন্যও বাসের টিকেট বুকিং দিয়ে রেখো। সৈকত বলল তোমার তো অনেক জ্বর। আমি বললাম কিছু হবে না চট্টগ্রাম গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার পরিবারের কাউকে আমি বুঝতে দেইনি যে আমি অসুস্থ। তারা জানলে এই অবস্থায় আমাকে যেতে দিবেনা। মিজান বাদে আমাদের সাত জনের বাসের টিকেট বুকিং করা হয়েছে। তখনও মিজান কনফার্ম করেনি যে সে আমাদের সাথে যাচ্ছে। 
আগেরদিন রাতে ব্যাগ গোছানো শুরু। সারারাত ঘুম হয়নি,খুব সকালে ঘর থেকে বের হয়ে এদিক সেদিক হাটতে শুরু করলাম। মন খুব অস্থির, সময় কাটছে না। রাত ১১:৩০ মিনিটে ঢাকা সায়দাবাদ থেকে বাস ছাড়বে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সবার সাথে যোগাযোগ করতে থাকি। কে কখন বাহির হবে সেই খবর আদান-প্রদান চলছিল। বিকেলে সবাই একত্র হয়ে জানতে পারলাম মিজান আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। মিজান যাচ্ছে বলে সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম। রাত ৯টার সময় ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে সবাই যাত্রা করলাম সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের পথে। 
যেই বাসটিতে যাবো সেই বাসে আমাদের সাত জনের আসন বুকিং করা। মিজানের জন্য এখন একটি টিকেট করতে হবে। কিন্ত আসন খালি নেই। অনেক আকুতি-মিনতি করে টিকেট মাস্টারকে রাজি করলাম। শর্ত ছিল মিজানকে আমাদের সাতজনের সাথে একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। মিজান,মিরাজ আর রনি চাপাচাপি করে এক সাথে বসলো। যথাসময়ে বাসটি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। হইচই করে আমরা মাতিয়ে তুললাম পুরো বাস। রাতের ভ্রমন,সবাই ঘুমানোর চেষ্টা করছে। আমাদের হইচই করার কারণে অন্য যাত্রীরা বিরিক্ত হচ্ছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু এই নিয়ে ভাবার সময় কী আমাদের আছে, আমদের হইচই চলতেই থাকলো। বাস ছুটে চলছিল তার আপন গতিতে। 
মধ্য পথে ২০ মিনিট যাত্রা বিরতিতে চা-নাস্তা খেয়ে নিলাম। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো একটু একটু করে উকি দিয়ে যাচ্ছিল। পাখিরা সব কিচির মিচির করছিল ঠিক সেই সময় আমরাআগ্রাবাদ গিয়ে পৌছি। আগ্রাবাদ থেকে সি এন জি অটোরিক্সা ভাড়া করি ১৫ নাম্বার ঘাট যাওয়ার জন্য। পুরোপুরি নিরব একটি পরিবেশে অটোরিক্সা চলছিল। পথে মানুষের আনা গোনা খুব কম। ১৫ নাম্বার ঘাট যেতে সময় লেগেছিল ৩০ মিনিটের মত। ঘাট খুব ব্যস্ত,অসংখ্য নৌকা। মাঝিরা ডাক দিচ্ছিল আমার নৌকায় উঠেন। ঘাটে ভিড়ানো ছিল বিশাল বড় বড় জাহাজ-লঞ্চ। আরো দেখতে পেয়েছিলাম নৌ-বাহিনীর একটা অনেক বড় যুদ্ধ জাহাজ। এই জাহাজটি দিয়ে এখানে নৌ-বাহিনীরা সমুদ্র পথে নজরদারী করে বলে জেনেছিলাম। একটি নৌকায় উঠে বসলাম সমুদ্রের বুকে পারি দিয়ে ওপারে যাওয়ার জন্য। ওপারের ঘাটটি এই ঘাটে দাড়িয়েই দেখা যাচ্ছিল। খুব বেশি সময় লাগলো না সেখানে যেতে। যাওয়ার পথে মাহির সানগ্লাস পানিতে পড়ে গিয়েছিল। বেচারা মাহি দামী সানগ্লাস হারিয়ে খুব দুঃখ পেলো। সি ফিল যাওয়াটা অনেক কষ্টকর তাই অনেকেই যেতে চায় না। নৌকা থেকে নেমে আবার অটোরিক্সা ভাড়া করা হলো। এবার সরাসরি গৌন্তব্য সি ফিল বিচ। অটোরিক্সা থেকে নেমে গ্রামের ভিতর দিয়ে আকা-বাকা পথে হেটে গিয়ে অবশেষে দেখা মিললআমাদের এতদিনের স্বপ্নে দেখা সেই জায়গার। ঝাও বনের কাছে আছে কিছু দোকান। দোকানে পাওয়া যায় খাবারের অনেক কিছুই কিন্তু এই বিচে এবং আসে পাশে নেই থাকার কোনো ব্যবস্থা। শুধু মাত্র এই কারণে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। আমরা যখন গিয়েছিআমরা আট জন ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাইনি। পূর্বে থেকেই ঠিক করেছিলাম একটি রাতআমরা বিচে কাটাব। বিচের পাশের দোকান গুলো বন্ধ হয়ে যায় সন্ধা সাত টায়। একটি দোকানদার বলল আমাদের জন্য সে দোকান মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা রাখবে। দোকানদার আমাদেরকে কিছু চেয়ারের ব্যবস্থা করে দিলেন। তাকে খুব খুশি মনে হচ্ছিল এক সাথে এতগুলো ক্রেতা পেয়ে। দুপুরে খাবার খেয়ে সমুদ্রের পাড়ে চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছিলাম। কেউ কেউ এদিক সেদিক হাটছিল। দুরে অনেক গুলো মালবাহী জাহাজ দেখতে পাচ্ছিলাম। বিকেল পেরিয়ে সন্ধা হয়ে এলো। লাল টকটকে সূর্যটা মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেলো,সে যেন সমুদ্রে ডুব দিলো। 
আর একটু পরেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা পুরো রাতের জন্য খাবার কিনে নিলাম। একে একে সব গুলো দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সমুদ্রের বিচে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। ভয়ংকর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো। দু'একটা কুকুর আসে পাশে ঘুর ঘুর করছিল। সেদিন পূর্নিমা থাকায় চাদের আলো বাতির আলোর মত আলোকিত করে রেখেছিল গোটা এলাকা। সবাই মিলে বালি খুড়ে বাবু ভাইকে বালির ভিতর চাপা দিলাম। দীর্ঘ সময় অভাবে আটকে রেখে তাকে মুক্তি দেয়ার পরই সে দৌড়ে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে। তার সাথে আমরাও। মধ্য রাতে একটি বোতল দিয়ে ফুটবল খেলা শুরু হলো। এক মুহুর্তে রনিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা খুব ভয় পেলাম। খোজা শুরু হলো রনিকে। দেখতে পেলাম রনি একটি জায়গায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। সবাই সেখানে বসে পড়লাম বালিতে। সবাই যেন নিজ নিজ ভাবনায় মগ্ন হয়ে পরলাম। সবাই চুপচাপ। নিরবতা। একজনকে খুব মনে পড়ছিল সেই মুহুর্তে আমার। সমুদ্রের গর্জন শোনা,আর সমুদ্রের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবনা। রোমান্টিকতা অনুভব করছিলাম হৃদয়ের গভীরে। এভাবেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেকে নিয়ে। ভোর হওয়ার সাথে সাথেই আমরা কক্স-বাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সাথে নিয়ে যাচ্ছিলাম ভয়ংকর পরিবেশে কাটানো একটি রাতের অভিজ্ঞতা। ভিন্নভাবে কাটানো কিছু স্মৃতি। 


২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, দৈনিক সংবাদের দূরে কোথাও পাতায় প্রকাশিত 

Saturday, May 30, 2015

উত্তরের রাজবাড়িতে

  • রফিকুল ইসলাম সাগর 
রাত ১২টায় বাস ছাড়বে নাটোরের উদ্দেশ্যে। একে একে সবাই এসে হাজির বনানী সবুজ সংঘ ক্লাবের সামনে। জাহাঙ্গীর আলম সবাইকে আগেই বলে দিয়েছিল অতিরিক্ত শীতের কাপড় আনতে। সবাই তাই করেছে। একে একে সবাই চলে এলে বাস ছেড়ে দিল। বাস চলা শুরু করল। বাসের মৃদু দোলানীতে কেমন জানি ঝিমঝিম এসে গেল। চোখের ঘুম তাড়াতে সবাই মিলে গান ধরল- চলো না ঘুরে আসি অজানাতে....। 

খাদ্য মন্ত্রী পিংকি পড়ল বিপাকে। পিংকি বেশ মোটা তাজা বলে সবাই তাকে খাদ্যমন্ত্রী বলে ডাকে। ওকে নিয়ে গান শুরু হলো এবার। কেউ মোটা বলে ডাকছে, কেউ তার পেটে চিমটি কাটছে। এক পর্যায়ে পিংকি কেদে ফেললো। বড় ভাই আলমগীর বললো সবাইকে চুপ! এবং পিংকিকে বিরক্ত করতে সবাইকে নিষেধ করে দিলেন।
বাস চলছে..। জানালা দরজা বন্ধ। তারপরও প্রচন্ড শীত লাগছে। রাত যত গভীর হচ্ছে শীত ততো বাড়ছে। জড়োসড়ো ঝিমুতে ঝিমুতে প্রচন্ড ঠান্ডার একটা রাত পার করলাম আমরা।

নাটোরের রাজবাড়িতে যখন আমরা পৌছলাম তখন সকাল আটটা। সবার চোখ চলে গেল একটা শিব মন্দিরের দিকে। মাটির উপরে ঢালাই করা প্রায় বিশ ফিট উঁচু একটি প্ল্যাটফর্মের উপরে মন্দিরটি অবস্থিত। এখানে রয়েছে দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ পাশেই বিশাল একটা পুকুর। পুরো মন্দিরের স্থাপত্য এক কথায় অসাধারন। ভুনা খিচুরী দিয়ে সবাই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। বাবুর্চিকে রান্না-বান্না বুঝিয়ে দিয়ে সবাই দল বেধে ঘুরে দেখতে বেড় হয়ে গেলাম। তিনটি গ্রুপ হলো। বড় গ্রুপ,মেঝো গ্রুপ ও ছোট গ্রুপ। তিন গ্রুপ গেল তিন দিকে। সবাই রাজবাড়ির দৃশ্য কেমেরাবন্দি করায় বেস্ত হয়ে পড়ল। রাজবাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর। ছোট-বড় ৮টি ভবন আছে। আছে ২টি গভীর পুকুর ও ৫টি ছোট পুকুর আছে। রাজবাড়ি বেষ্টন করে আছে দুই স্তরের বেড় চৌকি। পুরো এলাকা ২টি অংশে বিভক্ত – ছোট তরফ ও বড় তরফ। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে সবাই ফিরে এলাম বাসের সামনে। সেরে নিলাম দুপুরের খাওয়া-দাওয়া। খাওয়ার পর কারও শরীর যেন আর চলেনা। সবাই বসে পড়লাম আড্ডায়। গান আর গল্পে জমে উঠল আড্ডা। আড্ডা শেষ করে রাজবাড়ির মেলা থেকে কেনাকাটা করতে চলে গেলাম সবাই।

রনির নির্দেশ সন্ধার মধ্যে সবাই চলে আসতে হবে আমাদের। সন্ধায় আমরা সবাই বাসে চড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সবাইকে আনন্দ দিতে সাইফুল চালকের পাশে দাড়িয়ে বললো, আমি যাকে ডাকব তাকে এখানে এসে গান গাইতে হবে। সবাই রাজি হলো। প্রথম ডাক পড়ল বড় ভাই আলমগীর। আলমগীর ভাই গান গাইতে চাইছিল না। সবার অনুরোধে সে গান গাইতে বাধ্য হলো। একে একে গান গাইল আমিনুল,জাহিদ,আরিফ,এনামুল,সাগর,আনারুল,হাবিবুল্লা,সম্মির,হালিম,ইয়াসিন,বাবু,ইব্রাহিম। রনিকে গান গাইতে বলার পড়ে রনি গাইল- ''আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালবাসি''। পন্ডিতকে গান গাইতে ডাকার পড়ে পন্ডিত বললো, আমি গান গাইতে পারবো না, আপনারা সবাই আমাকে একশ টাকা করে দেন আমি একটা ফুটবল কিনব। এই কথা শুনে বাসে সবাই হি হি হো হো করে হেসে দিল। হই চৈ করতে করতে আমরা ঢাকায় ফিরলাম।

 ১৯ জানুয়ারী ২০১২ বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত