Showing posts with label জীবন থেকে নেয়া. Show all posts
Showing posts with label জীবন থেকে নেয়া. Show all posts

Wednesday, January 13, 2016

স্কুল ম্যাগাজিন এবং স্বপ্ন ভঙ্গ

রফিকুল ইসলাম সাগর 


ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ের কথা। আমাদের স্কুল থেকে ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হবে, একদিন ক্লাস চলাকালীন এমন ঘোষণা দেয়া হলো। জানতে পারলাম, ম্যাগাজিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত কিছুসংখ্যক লেখা ও আঁকা স্থান পাবে। এতে লেখা দিতে আগ্রহীদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে লেখা/আঁকা জমা দিতে আহ্বান করা হলো। লেখা/আঁকা জমা দিতে হবে আবুল কাশেম স্যারের কাছে। ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য তিনিই লেখা নির্বাচিত করবেন। এ কাজে স্যারকে সহযোগিতা করতে গোটা স্কুল থেকে দুজন শিক্ষার্থীকে বাছাই করা হলো। ভাগ্যক্রমে সে দুজনের মধ্যে একজন ছিলাম আমি। আরেকজন আমারই সহপাঠী। তবে এখানে যে কথা না বললেই নয়, আমার মধ্যে বিশেষ কোনো প্রতিভা থাকায় যে স্যার আমাকে বাছাই করেছিলেন তা নয়। আসল ঘটনা হলো, স্যার তাকে সহযোগিতা করার জন্য ক্লাস নাইন থেকে দুজন শিক্ষার্থীকে নিবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তিনি যখন আমাদের ক্লাসে এসে প্রস্তাব দিলেন, ‘যারা আমাকে সহযোগিতা করতে চাও হাত উঠাও।’ স্যারের কথা শুনে আমি হাত উঠালাম। মনে করেছিলাম আরও অনেকেই হাত তুলবে। কিন্তু গোটা ক্লাসের মধ্যে মাত্র দুজন হাত তুলেছি। এমন চিত্র দেখে শুধু আমিই না, স্যারও অবাক হয়েছিলেন। আমি ছিলাম ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসা ক্যাটাগরির এবং প্রতিদিন পড়া না পারা টাইপের ছাত্র। আমার মাঝে এমন অসাধারণ(!) প্রতিভা থাকায় স্যার প্রথমে আমাকে নিতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু ক্লাসের কোনো গুডবয়কে রাজি করাতে না পেরে আমার মতো ব্যাডবয়কে নিলেন বাধ্য হয়েই বলা চলে। আর আমিও যেন হাত উঠিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম। 

স্যার আমাদের দুজনকে সাথে করে শিক্ষকরুমে নিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলেন। তার পক্ষ থেকে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লেখা/আঁকা সংগ্রহ করার দায়িত্ব পেলাম আমরা। টিফিন টাইমে প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে লেখা/আঁকা সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। কেউ কেউ নিজের লেখা জমা দেওয়ার জন্য আমার ক্লাসে আসছে। এসে যখন আমাকে খোঁজ করত তখন আমার ভাব দেখে কে! মজার ব্যাপার হলো ১ম, ২য়, ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও ওদের কচি হাতের লেখা/আঁকা জমা দেয়া শুরু করল। ওদের চোখে দেখতে পেতাম অন্যরকম আগ্রহ আর আনন্দ। ওদের মধ্যে কারও কারও লেখা/আঁকা ছিল বড়দেরও ভাবিয়ে তুলবার মতো। আমার এক বন্ধু সজীব প্রতিদিন একটি করে কবিতা জমা দিত। বিভিন্ন গান থেকে দুই কলি অথবা তিন কলি চুরি করে বন্ধু দশ লাইনের কবিতা লিখত।
লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি সবচেয়ে আনন্দ পেতাম যখন লেখা জমা দিতে এসে কেউ লেখা ম্যাগাজিনে ছাপানোর জন্য আকুতি-মিনতি করত, যেন লেখা নির্বাচন করার ক্ষমতা আমারই হাতে। এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে তখন অনেক ক্ষমতাবান মনে হতো। প্রতিদিন সংগ্রহ করা লেখাগুলো স্কুল ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। সপ্তাহে একবার সংগ্রহ করা সব লেখা/আঁকা একত্রে স্যারকে বুঝিয়ে দিতাম। এভাবে লেখা সংগ্রহের কাজ করলাম এক মাস। এই কাজ করতে গিয়ে নিজের মধ্যেও লেখক হওয়ার স্বপ্ন জেগে উঠল। আর তাই প্রতি সপ্তাহে সবার লেখার সাথে নিজের দু-চারটি লেখা ঢুকিয়ে দিয়ে স্যারের হাতে তুলে দিতাম। এক মাসে শুধু নিজের লেখাই জমা দিলাম কমপক্ষে ৫০টি। ধরে নিয়েছিলাম ম্যাগাজিনে আমার কমপক্ষে দশখানা লেখা তো প্রকাশ হবেই। আরও ভাবলাম, স্যারের জন্য কাজ করেছি সেই সূত্রে স্যার তো আমার লেখাগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখবেন এটা তো কনফার্ম। 


লেখা সংগ্রহ শেষে অতঃপর নির্বাচিত লেখা/আঁকা নিয়ে ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজ শুরু হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ম্যাগাজিন সবার হাতে হাতে পৌঁছে যাবে। ম্যাগাজিন হাতে পাওয়ার চিন্তায় আমার রাতে ঘুম হয় না। অবশেষে একদিন ম্যাগাজিন হাতে পেলাম আর কি যে খুশি হলাম। অতি আগ্রহে প্রথম পাতা উল্টালাম, পরে দ্বিতীয় পাতা উল্টালামÑ একে একে শেষ পাতা পর্যন্ত দেখলাম। একি কেলেঙ্কারি কাণ্ড! আমার নাম কোথাও দেখতে পেলাম না। সম্ভবত আমার দেখতে ভুল হয়েছে, কোনো পাতা উল্টানোর সময় মনে হয় একসাথে দু-তিন পাতা উল্টিয়েছি এই ভেবে আবার শুরু থেকে পাতা উল্টিয়ে সূক্ষ্মভাবে দেখা শুরু করলাম। এবার হাতের আঙ্গুলে থুতু লাগিয়ে পাতা উল্টাতে লাগলাম। শেষ পাতা পর্যন্ত আবারও দেখলাম কোথাও আমার নাম নেই। আবার মনে হয় দেখায় ভুল ছিল। নাহ! এবার মনে হলো, এই ম্যাগাজিনেই সমস্যা। অন্য আরেকটি ম্যাগাজিন নিলাম। তাতেও আমার লেখা তো দূরে থাক কোথাও আমার নামই নেই। আমার একটি লেখাও প্রকাশ হলো না, লজ্জায় মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়ল। অপমানে এবার বন্ধুদের সামনে নিজের মুখখানা করুণ-অসহায়ের মতো অনুভব করলাম। মুহূর্তেই যেন আকাশ থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়লাম। কয়েকদিন পর এক চাচার বাসায় বেড়াতে গেলাম। সেখানে চাচি প্রশ্ন করলেন, স্কুল ম্যাগাজিনে তোমার লেখা কোনটা? চাচাতো বোন একই স্কুলে পড়ায় চাচির হাতেও পৌঁছে গিয়েছিল ম্যাগাজিন। চাচির প্রশ্নে আমার যেন কাটা ঘায়ে লবণ দেয়ার মতো জ্বালা লাগল।



Friday, December 25, 2015

বিদেশে ভিক্ষা

রফিকুল ইসলাম সাগর
আমাদের দেশে ভিক্ষুকরা হাত পেতে নির্লজ্জের মতো ভিক্ষা করে। কিন্তু বাইরের দেশগুলোতে ভিক্ষুকরা ভিক্ষা করে নানাভাবে তাদের প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যমে পরিশ্রম করে। এতে মানুষ বিনোদন পায়, খুশি হয়ে তাদের টাকা দেয়। প্রথম যেদিন কুয়ালালামপুর গিয়েছিলাম, শহরের বুকিট বিনতাং নামক এলাকার ব্যস্ততম রাস্তায় এ রকম দৃশ্য দেখে অবাক হয়েছিলাম।

দেখতে পেলাম একটি স্থানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেছে। সেখানে ক'জন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। যে সুর আমার কানে ভেসে আসছিল, যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, তাদের ঘিরেই মানুষগুলোর ভিড়। সেখান থেকে আমি মোটামুটি দূরেই ছিলাম। বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তাদের সৃষ্টি করা অসাধারণ সুর প্রথমে আমার কানে ভেসে আসে। এমন অসাধারণ সুর যা যে কাউকেই আকর্ষণ করবে। আমাকেও আকর্ষণ করল। আশপাশে তাকিয়ে যখন বুঝতে পারলাম সুরটা কোথা থেকে আসছে তখন এগিয়ে যাওয়ার সময় ভাবলাম, সম্ভবত মালয়েশিয়ান কোনো সেলিব্রেটি শিল্পীর কনসার্ট হচ্ছে। একেবারে কাছাকাছি গিয়ে যখন অন্য দর্শনার্থীদের সঙ্গে দাঁড়ালাম, তখন যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে তাদের সবাইকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। পাঁচ-ছয়জনের একটি দল। এদের মধ্যে একজন বাঁশি বাজাচ্ছে, একজন মাউথওর্গান বাজাচ্ছে, একজন বেহালা, একজন গিটার বাজাচ্ছে। খেয়াল করলাম এদের সবাই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। কারও পা নেই, হুইল চেয়ারে বসে বাজাচ্ছে। আবার কেউ অন্ধ। মনে মনে এদের সবাইকে স্যালুট জানিয়েছিলাম। কী দারুণ প্রতিভা তাদের। যারা সরাসরি দেখেননি তাদের বোঝানো আমার পক্ষে কষ্টকর। একজন হুইল চেয়ারে বসে ঘুরে ঘুরে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলছে। যার ইচ্ছা টাকা দিচ্ছে, কেউ আবার দিচ্ছে না। কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। পরে জানতে পারলাম, এটি মালয়েশিয়ায় ভিক্ষা করার পদ্ধতি। এখানে এত সহজে ভিক্ষা মেলে না। ভিক্ষুকরা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও নানা প্রতিভা প্রকাশ করে ভিক্ষা নেয়। কোনো কোনো ভিক্ষুক টিস্যু বিক্রি করে। কোনো ভিক্ষুক নিজ হস্তে বানানো জিনিসপত্র বিক্রি করে। এ ধরনের ভিক্ষুকদের কাছ থেকে যারা জিনিসপত্র কেনেন তারা জিনিসের প্রকৃত মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি দয়া হলে অতিরিক্ত টাকা দান করেন। 
পুডু নামক একটি স্থানে প্রায়ই আমার চলাচল ছিল। সেখান থেকে আম্পাং নামক স্থানে (আম্পাং এলাকায় আমি থাকতাম) ফেরার সময় রেলস্টেশনে প্রবেশের রাস্তায় সবসময় দু'জন ভিক্ষুককে দেখতে পেতাম। দু'জনেই অন্ধ। বুড়াবুড়ি স্বামী-স্ত্রী। সবসময় দেখতাম তারা খালি গলায় কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান গায়। দুটি ছোট ছোট সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে দূর থেকেও তাদের গান শুনতে পাওয়া যেত। যদিও গানের গলা খুব বাজে ছিল। শুনতে কেমন জানি লাগত। তবে বুড়াবুড়ি দু'জনকে দেখলে খুব মায়া হতো। কারও বয়স ৭০ বছরের নিচে হবে না। বয়সের ভারে দু'জনই নুইয়ে পড়েছেন। শরীরের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। বুড়ার দাঁত প্রায় সবই পড়ে গেছে। এই বুড়াবুড়ির চেহারা প্রায়ই আমার চোখে ভেসে ওঠে। বুড়িকে দেখতাম বসে বুড়ার কাঁধে একহাত রেখে মাথা নিচু করে গান গাইত। বুড়ার পরনে থাকত মালয়েশিয়ান পাঞ্জাবি (স্থানীয় নাম 'বাজুরায়া'), মাথায় টুপি। দু'জনের চোখে কালো চশমা।

Wednesday, October 14, 2015

স্কুল জীবনের স্মৃতি

রফিকুল ইসলাম সাগর

ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্লাসের ইংলিশ স্যার (সুব্রত বড়ুয়া) ক্লাস চলাকালীন সময় প্রায়ই আমাদের উপর রেগে গিয়ে যে কথাগুলো বলতেন তা হলো, ‘এখন তোদের চোখে রঙিন চশমা তাই সব কিছুই রঙিন লাগে। সব কিছুই সুন্দর লাগে। একদিন চোখের এই রঙিন চশমা খুলে যাবে। সব রঙিন স্বপ্ন সাদাকালো হয়ে যাবে।’ কথাগুলো তিনি বলতেন যখন আমরা পড়া পারতাম না। পড়া লেখা না করলে সব রঙিন স্বপ্নই সাদাকালো হয়ে যাবে তিনি তাই আমাদের বুঝাতেন।
তিনি বলতেন, ‘তোদের এখন যে বয়স এটা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। একদিন এই দিনের জন্য আফসোস করবি। তোদের বাবা-মা কত কষ্ট করে তোদের লেখাপড়া করতে পাঠায়। হেলাফেলায় সময় নষ্ট করিস না।’ স্যারের সেই কথাগুলো খুব মনে পড়ে। বছর চারেক আগে আমাদের সেই স্যার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সেদিন আমরা স্কুলের অনেক বন্ধু স্কুলে গিয়েছিলাম। স্মৃতিচারণ করেছিলাম স্কুল জীবনের অনেক কথা।
আমি প্রচুর স্কুল ফাকি দিতাম। স্কুলে গেলে সব সময় বসতাম লাস্ট বেঞ্চে। পরীক্ষায় পাস করতাম কোনো রকমে টেনেটুনে। যখন রেজাল্ট কার্ড পেতাম সেটা বাড়িতে দেখানো নিয়ে করতাম নানা তালবাহানা। কাউকে না দেখিয়েই স্কুলে জমা দিয়ে দিতাম। আম্মার স্বাক্ষর নকল করতাম। নিজেই রেজাল্ট কার্ডে স্বাক্ষর করে দিতাম। কত মধুর ছিল সেই স্মৃতিগুলো।
আমাদের স্কুলের আরেক শিক্ষক বিজয় কৃষ্ণ মুন্সী স্যার। তিনি ছিলেন ক্লাস এইটে আমাদের শ্রেণী শিক্ষক (অংক)। তার সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। অনেক ছাত্রেরই প্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন অংকে স্কুলের সেরা শিক্ষক। আমি তার বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তাম। স্যার কেন জানি ‘মামা’ শব্দটাকে খুব অপছন্দ করতেন। মামা শব্দটা শুনলে খুব খেপতেন। আর তাই স্কুলে, রাস্তায় অনেক ছাত্ররাই স্যারকে মামা বলে খেপাত। পেছন থেকে ‘ওই মামা’ বলে ছাত্ররা লুকিয়ে পরত। স্যার তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেত না। আবার অনেক সময় কেউ কেউ স্যারের কাছে ধরা পড়েও যেত। যে ধরা পরত তার উত্তম-মাধ্যম খাওয়া তো মিস ছিল না। একদিন আমি স্যারের সাথে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছি। তখন একটা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে শব্দ শোনা গেল মামা... ওই মামা... মামা....। স্যারের সাথে আমিও উপরের দিকে তাকিয়ে চেহারা স্পষ্ট দেখার আগেই দেখলাম দু’জন লুকিয়ে পড়েছে। স্যার আমাকে বললেন, চিনতে পেরেছিস? আমি বললাম, না স্যার। আবার দু’জন হাঁটা শুরু করি। ওরা আবার শুরু করল, ওই মামা... মামা...। আমার তো হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হওয়ার দশা কিন্তু জোর করে হাসি চেপে রাখলাম নয়তো সে মুহূর্তে ওদের রাগ স্যার আমার ওপরই মেটাতেন।
আরেক দিন সকালের ঘটনা। আমি আর স্যার একটি হোটেলে নাস্তা খেতে বসেছি। হোটেলের ওয়েটাররা তো সবাইকে সাধারণত মামা বলেই ডাকে। তো ওয়েটার বলল, মামা কী খাইবেন? সাথে সাথে স্যার উঠে দাঁড়ালেন। আর ওয়েটারের গালে কশিয়ে চর বসিয়ে দিয়ে বললেন, আমাকে মামা বললি কেন? সেই মুহূর্তে আমি স্যারকে থামিয়ে দিয়ে তার গরম মাথা ঠাণ্ডা করলাম। তারপর থেকে সেই ওয়েটারও রাস্তায় স্যারকে দেখলে মামা বলে পালিয়ে যেত। এমন অসংখ্য খণ্ড খণ্ড স্মৃতি প্রায়ই হাসায়, ভাবায়, কাদায়।

Wednesday, July 15, 2015

মোবাইলের কিছু স্মৃতি কিছু অভিজ্ঞতা


  • রফিকুল ইসলাম সাগর  

অনেক বছর আগের কথা। তখন আমাদের বংশের মধ্যে মোবাইল ছিল ছোট চাচার আর আমার বাবার। বাবা মোবাইল সম্পর্কে কিছুই বুঝতেন না, আমরাও কিছুই বুঝতাম না বললেই চলে। তবে এতটুকু ধারণা ছিল যে নাম্বার চেপে নির্দিষ্টি একটি বাটনে টিপ দিলে ফোন করা যায়। আমার বড় ভাই প্রথম বাবাকে দেখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে মোবাইল থেকে ফোন করতে হয়।

আমিও একটু-আকটু শিখে নিয়েছিলাম তখন। কিন্তু বাবার মোবাইল ধরতে সাহস হতো না। ধরলে যদি আবার কোনো বাটনে টিপ লেগে কিছু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে বাবা বাথরুমে গেলে তখন যদি বাবার মোবাইলে কেউ ফোন করতো তাহলে ফোন রিসিভ করতাম, মোবাইলটি ধরতে গেলে হাত কাপত। বাটনে টিপ দিয়ে ফোন রিসিভ করে যখন ওপর প্রান্তের মানুষটির সাথে কথা বলতাম নিজেকে খুব বড় বড় মনে হতো। বাইরে বের হলে বন্ধুদের বলে বেড়াতাম আজ আমি আমার আব্বার মোবাইল দিয়ে কথা বলেছি। আমি তো সেই মুহুর্তে বন্ধু মহলের নায়ক। বন্ধুদের দিকে তাহলে মনে হতো তাদের খুব মন খারাপ, তাদের খুব হিংসে হচ্ছে তাদের বাবার কেন মোবাইল নাই? তারা কেন কথা বলতে পারেনা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। 
একটা সময় বাবার মোবাইল হাতে নেয়ার সাহস পাই। বাবা ঘুমিয়ে থাকলে মোবাইল লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। কী যে ভাব আমার। আমার হাতে মোবাইল। মানুষ জন আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। আমি মাঝে মাঝে হুদাই মোবাইলের রিংটোন বাজাতাম আবার ক্যানসেল বাটনে টিপ দিয়ে মোবাইল কানে চেপে ধরে বলতাম হ্যালো....পরে আবার বলতাম রং নাম্বার। আর বন্ধুদের সামনে গিয়ে যেই একটা ভাব নিতাম 'আমার আব্বার মোবাইল' আমারে আর পায় কে। ষ্টুডিওতে মোবাইল হাতে নিয়ে অথবা কানে চেপে ধরে নানান ভাব-ভঙ্গিতে ছবি তুলতাম। তখন আসে পাশের একশ পরিবারে একটি মোবাইল থাকা স্বপ্নের মত ছিল। আসল মোবাইল হাতে নিয়ে ছবি তোলা তো বিশাল ব্যাপার। 

২
একটা পর্যায়ে প্রায় সময়ে নানান প্রয়োজনে দোকান থেকে দশ টাকা মিনিটে বাবাকে আমাদের ফোন করতে হতো। একদিন বাবা বাসাতেও আম্মার জন্য মোবাইল কেনার প্রয়োজন অনুভব করে। আম্মার হাতেও মোবাইল চলে এলো। আম্মা মোবাইল সম্পর্কে কিছুই বুঝেনা, শিখিয়ে দিলেও ভুলে যায়। সেই সুবাদে মোবাইল থাকতো আমার কাছে নয়তো ভাইয়ার কাছে। ভাইয়া বাসায় থাকলে তার কাছে আর বাইরে থাকলে আমার কাছে। বাসায় কেউ বেড়াতে এলে হুদাই রিংটোন বাজাতাম এটাই ছিল সেই সময়ে মোবাইলের ফ্যাশন। আমাদের মোবাইল আছে দেখাতে হবে না। একটা সময়ে ভাইয়া মোবাইল পেলো। আব্বার সিটিসেল মোবাইলটিতে অন্য কোনো সিম বা রিম কার্ড ব্যবহার করা যেত না। গ্রামীন ফোন বাংলাদেশে এলো। আব্বা মোবাইল পরিবর্তন করে গ্রামীনের সিম কার্ড কিনে। আমি পেলাম ব্যবহার করার জন্য আব্বার পুরাতন সিটিসেল মোবাইল। এরপরেই সিটিসেল মোবাইল নিয়ে এলো যে মোবাইলে রিম কার্ড ব্যবহার করা যায়। 

৩
টেলিটক নামে সরকারী মোবাইল ফোন বাজারে আসবে। সবার আকর্ষণ সেই সিম কার্ডের দিকে। এ যেন সোনার ডিম পারা মুরগী। টি এন্ড টি ল্যান্ড ফোনেও ফোন করা যাবে, ইনকামিং এর সুবিধাও আছে। মোবাইল আর ল্যান্ড ফোন সমান টাকায় কথা বলা যাবে। এছাড়া সব চেয়ে কম কল চার্জ। এই সিম কার্ড তো লাগবেই। কীভাবে পাওয়া যায়? অপেক্ষা।....
অনেকের সাথে টেলিটক সিম কিনতে টি এন্ড টি অফিসের সামনে লাইনে দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের পারা, চাপা খেয়ে, ঠেলাঠেলি করেও সিম পাইনি। কী আর করা....
খালাতো ভাইদের সাথে আগের দিন রাতে কাথা-বালিশ নিয়ে চলে গেলাম টি এন্ড টি অফিসের সামনে। গিয়ে দেখি এ কী কান্ড আমাদের আগেই শত শত মানুষ কাথা-বালিশ নিয়ে সেখানে সিরিয়াল দিয়ে বসে আছে। এবারও টেলিটক সিম পেলাম না। ঠিক করলাম দূর এত কষ্ট ! সিমই কিনুম না। 

৪
ঘোষণা দেয়া হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে আবেদন করলে লটারির মাধ্যমে টেলিটক সিম বিক্রি হবে। পরিবারের সবার নামে আবেদন করলাম। লটারিতে বাবার নাম এলো। আর দেরী না করে ২,৯০০শ' টাকায় সিম কিনে আনলাম। ইয়াহু..... আমি আলাদিনের চেরাগ পাইছি।

এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল। মোবাইল ফোন এবং সিম কার্ড কোম্পানিদের এমন ভাব 'এত কম দামে মোবাইল দিতাছি তার পরেও কিনবেন না কেন'? সবাই মোবাইল ফোনের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার বুঝতে শিখেছে। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে সারাদিন টিভিতে, পত্রিকায় এত এত মোবাইল ফোন ও সিম কার্ডের বিজ্ঞাপন মোবাইল না কিনে উপায় আছে। মোবাইল ছাড়া আমরা বলতে গেলে এখন অচল। যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক সহজ।
আমার বাবা এখনো মোবাইল থেকে ফোন করা ও ফোন রিসিভ ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। মোবাইল নিয়ে খুব একটা সময় ব্যয় করেনা বলেই এমন। বাবা বাসায় এলেই ডেকে বলবে আমার মোবাইলে নাম্বার সেভ করে দে।
আগের দিনে বেশির ভাগ মানুষ মোবাইলে নাম্বার সেভ করে রাখত না। সাথে ছোট একটি ডায়রি থাকতো সেই ডায়রিতে প্রয়োজনীয় সব নাম্বার লেখা থাকতো। আর এখন কার মোবাইলে কত গুলো নাম্বার সেভ করা আছে, কার মোবাইলের ফোনবুকে কত বেশি নাম্বার সেভ করা যায় সেই প্রতিযোগিতা। 

৫
একটা সময়ে টিভিতে ফান করে দেখানো হতো অথবা কার্টুন আকা হতো ফকিরের হাতে মোবাইল, রিক্সা চালকের হাতে মোবাইল। কিন্তু এখন এই চিত্র বাস্তব। অনেক আগের কথা তখন সিটিসেল ২,৫০০শ'  টাকায় মোবাইল ফোন দিচ্ছে। যে কেউ মোবাইল কেনা শুরু করল। একদিন সিটিসেল কাস্টমার কেয়ারে যাই। একজন লোক পড়নে ছিল লুঙ্গি আর শার্ট। তার পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। তার সমস্যা তার মোবাইল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কেন বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা তিনি জানতে চান। তার অভিযোগ নতুন মোবাইল বন্ধ হয়ে যাবে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছেন না। মানবেই বা কেন টাকা কী গাছে ধরে? ফাইজলামি পাইছে নাকি...। 

-স্যার আপনার সমস্যা কী?
-আমার মোবাইল বন্ধ হইয়া গেছে। 
-আপনার মোবাইলের সাথে যে চার্জারটা দেয়া হয়েছিল সেই চার্জার এনেছেন? 
-চার্জার আবার কী?
-চার্জার হলো যেটা দিয়ে মোবাইলে চার্জ দেয়া হয়। 
-ওইযে মোবাইলে সাথে যে একটা লম্বা তার দিছে সেইটা?
-হ্যা স্যার সেটা। সেটা দিয়ে মোবাইলে চার্জ দিতে হয়। চার্জ শেষ হলে মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। 
-চার্জ ক্যামনে দেয়? কাস্টমারের এমন উত্তরে কাস্টমার ম্যানেজার একটি চার্জার এনে তার মোবাইলে লাগিয়ে দেখিয়ে দিলো। 
-ও আইচ্ছা.....এইবার বুচ্ছি বলে লুঙ্গি পড়া লোকটা চলে গেল। 

৬
আগে মোবাইল ফোন সম্পর্কে মানুষ অজ্ঞ থাকলেও এখন সবাই সব বুঝে। কিভাবে গান শুনতে হয়,ছবি তুলতে হয়, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে হয় সব। বাজারে এক সময় যে কেউ সিম কিনতে পরেছে। ১৮ বছরের নিচে কারো কাছে সিম বিক্রির অনুমতি না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে। পরিচয় গোপন করে, ছদ্দ নামে অথবা রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সিম বিক্রি হয়েছে। এখনো যে হচ্ছে না তা না। এখন আগের চেয়ে একটু কঠিন হয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কথায় আছে টাকায় সব পাওয়া যায়। যে কারণে মোবাইল ফোনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ না করার মত পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ছোট একটা কাহিনী দিয়ে মোবাইলের প্যাচাল শেষ করব।

২৬ বছর বয়সী এক যুবক। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একটি মেয়ের সাথে তার প্রেম হয়। মোবাইল ফোনে প্রথম যেদিন মেয়েটির সাথে ছেলেটির কথা হয় সেদিন থেকেই তাদের প্রেম শুরু। ভয়াবহ রকমের প্রেম একদিনেই তারা তাদের বিয়ে নিয়ে নানান রকমের পরিকল্পনা করে ফেলেছে। বাচ্চা নিবে বিয়ের পাচ বছরপর। মেয়েটা সেদিনই জানতে পারে ছেলেটা বিদেশ যাবে। একদিনেই মেয়েটার বায়না 'না তুমি বিদেশ যেতে পারবা না। তুমি বিদেশ চলে গেলে আমার কী হবে?' 
সারারাত কথা হয় দু'জনের। ছেলেটার উরু উরু ভাব। এখন সে আর অভাবে নাই। তারও প্রেমিকা আছে। এখন শুধু একটা এয়ারটেলের সিমের অভাব। কারণ, মেয়েটার এয়ারটেল নাম্বার আর ছেলেটার বাংলালিংক। এখন একটা এয়ারটেল সিম কার্ড কিনতে হবে। 
ছেলেটার পুরানো একটা এয়ারটেল নাম্বার আছে কিন্তু সিম কার্ডটা হারিয়ে গিয়েছে। তো এখন সিমটা উঠাতে হবে। ছেলেটা কাস্টমার কেয়ারে গেল। কাস্টমার কেয়ারে গেলে 'এফ এন এফ' নাম্বার জানতে চাইবে। ছেলেটা অনেক চিন্তা করে 'এফ এন এফ' নাম্বার মনে করে। পুরা মুখস্থ প্রশ্ন করলেই উত্তর দিবে বলে ঠিক করে।  

-স্যার, আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? 
-আমার একটা সিম কার্ড হারিয়ে গিয়েছে। উঠাতে চাই।
-সিমটা কার নামে আছে স্যার?
-আমার নামেই আছে। 
-আপনার নাম?
-আমার নাম............
-আমরা দুঃখিত স্যার, সিমটা তো আপনার নামে নেই।
-কী কন সিমটা তো আমি-ই চালাইতাম। 
-না স্যার আপনার নামে তো নেই। 
-আমারে 'এফ এন এফ' নাম্বার জিগান? 
-না স্যার তা আর লাগবে না। আমরা সিম কার্ডটা আপনাকে দিতে পারছি না। 

উদাস মনে হতাশ ! হয়ে বেচারা খালি হাতে ফিরে আসে। মনে পড়ল যে সিম কার্ডটা যেখান থেকে কিনেছিল সেখান থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। দোকানদার অন্য নামে রেজিট্রেশন করেছে হয়তো। 
পথে এক বন্ধুর সাথে দেখা হতাশা ভরা কন্ঠে বন্ধুকে বলল দোস্ত আমার সিম আমারে দিলো না। 'এফ এন এফ' নাম্বার মুখস্থ কইরা গেলাম তা জিগাইলই না। 
এদিকে একদিনে প্রেম হওয়া প্রেমিকার নাম্বারে ফোন করে নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিদিন ট্রাই করতে করতে নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। খোলা থাকলেও ওয়েটিং পাওয়া যায় তারপর আবার বন্ধ......।

Saturday, June 27, 2015

স্কুল ফাকি


  • রফিকুল ইসলাম সাগর 

যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমি নিয়মিত স্কুলে যেতাম না। বাসার সবাই জানত আমি স্কুলে গিয়েছি। কিন্তু আমি স্কুল ফাকি দিতাম। যেদিন আমি স্কুলে উপস্থিত থাকতাম সেদিন পড়তাম নানা রকম ঝামেলায়। ক্লাসের শিক্ষকরা ক্লাস নিতে এলে আমাকে প্রশ্ন করতেন কী রে তুই কে? তোকে তো আগে কখনো এই ক্লাসে দেখিনি? নতুন ভর্তি হয়েছিস নাকি? আরো নানা রকম প্রশ্ন। আমি শুধু মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকতাম। ক্লাসের অন্য ছাত্রদের কাছে জানতে পারত আমি নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হই না। তার জন্য আমাকে অবশ্য উত্তম মধ্যম খেতে হতো যেদিন স্কুলে আসতাম,নিয়মিত স্কুলে না আসার জন্য এবং পড়া না পারার জন্য। স্কুলেই যাই না পড়া জানবো কী করে! আর এ খবর না জানা থাকলে পড়া শিখবো কী করে। তার জন্য তো উত্তম-মধ্যম খেতে হবেই। একদিন আমি স্কুলে যাইনি। কোন এক কারণবশত আমার বড় ভাই আমাদের স্কুলে গিয়েছিল সেখানে গিয়ে দেখে আমি স্কুলে নেই। আরো জানতে পারে আমি স্কুলেই যাই না। স্কুল ছুটির টাইম মতো আমি বাসায় হাজির। মা এবং বড় ভাই প্রস্তত আমার বিচার করবে। স্কুলে যাসনি কেন? প্রশ্ন করলেন বড় ভাই। মানে স্কুলে যাইনি তো কোথায় গিয়েছিলাম? আমি তো মাত্র স্কুল থেকেই ফিরলাম। পাল্টা জবাব দিলাম আমি। কিন্তু আমি তো তোকে স্কুলে গিয়ে দেখতে পেলাম না। বলল, বড় ভাই। তখন আমার বুঝতে দেরি হলো না যে, আজ ধরা পড়ে গিয়েছি। আর কোনো দিন স্কুল ফাকি দিবো না, এখন থেকে নিয়মিত স্কুলে যাবো। এ রকম শপথ করে সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছিলাম। পরে আর কোনদিন স্কুল ফাকি দেইনি। সেই স্মৃতি এখনো মনে পড়ে যায়।

দৈনিক নয়া দিগন্তের ফান ম্যাগাজিন থেরাপিতে প্রকাশিত (২০১১ সাল)।

Sunday, June 21, 2015

গুন্ডামি

রফিকুল ইসলাম সাগর 
এলাকার অনেক সিনিয়র এক বড় ভাই। যিনি ছিলেন এক সময়কার অনেক বড় গুন্ডা। তার জীবনে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের জন্য পুলিশের হাতে ধরা পরে জেল খেটেছেন। অসংখ্য নেতার ছত্রছায়ায় কাজ করেছেন। অনেকবার নেতা বদল হয়েছে। এক নেতার প্রয়োজন শেষে আরেক নেতার ডাক পরত। বলা চলে, নেতারা শুধু তাদের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করেছেন। প্রয়োজন ফুরালে নেতার এমন ভাব তাকে চিনেনই না। এই বড় ভাইয়ের জীবনের একটি গল্প কয়েকদিন আগে শুনলাম। গল্পটি আমি সবার জন্য উপস্থাপন করলাম। 

এই গল্পটি যাকে নিয়ে তার নাম প্রকাশ করছিনা। তরুণ বয়স থেকে তিনি অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পরেন। একসময়ে এই লাইনে তার অনেক নাম ডাক হয়। তার নিজ এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা গুলোতে তার নামে মানুষ ভয় পেতো। এলাকার অসংখ্য উঠতি ও ছোট বড় গুন্ডারা ছিল তার অনুসারী। এসব গুন্ডাদের নিয়ে ছিল তার বিশাল গ্যাং। জোর দখল, চাদাবাজি করে বেড়াতেন। তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আতঙ্ক। অবৈধ অস্রের জোরে দাঁপিয়ে বেড়াতেন যিনি। বর্তমানে তিনি তার জীবনের শেষ বয়সে। পুলিশের কাছে ধরা পরে পরে জেল খাটতে খাটতে এবং সামাজিক দিক থেকে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েছেন এ লাইন ছাড়তে। গুন্ডামি ছেড়েছেন প্রায় দশ পনের বছর আগে। বর্তমানে তার যেই অবস্থা তার পোশাক, চলাফেরা, কথাবার্তা, জীবন যাপন সব মিলিয়ে মানুষ তাকে পাগল মনে করে। তার আর্থিক অবস্থাও খুব দূর্বল। একজন অচেনা মানুষকে তাকে দেখিয়ে তার অতীতের ইতিহাস তুলে ধরলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না। হাস্যকর মনে হবে। কিন্তু সে সময়কার তার রঙিন জীবন যাপন এখনকার হাস্যকর গল্প মনে হলেও ছিল বাস্তব গল্প। 

অনেক বছর আগে নির্বাচনের আগের ঘটনা। সেবার নির্বাচনে যে নেতা পাশ করেছিলেন সেই নেতার হয়ে এই গল্পের নায়ক বড় ভাই এবং তার গ্রুপের সবাই নির্বাচন পর্যন্ত কাজ করেছিলেন। নেতাকে জেতাতে তারা অনেক কিছু করেছেন। সেসময়ে তাদের ভয়ে মানুষ কাপত। নির্বাচনের দিন নেতার জন্য কেন্দ্র দখল, ভোটারকে ভয় দেখানো সহ অনেক অসৎ পন্থা অবলম্বন করে তারা। তাদের দাপটে নেতা পাশ করেন। নেতা আগেই বুঝেছিল, এদের দিয়ে হবে। আর তাই নির্বাচনের আগে তাদের দেকে আপন করেনিয়েছিল। ছলে কৌশলে নেতা তাদের হাত করেছিল। তাদের জন্য নেতার মায়া দেখে তারা তো মনে করল, 'আহ! ভাই আমাদের কত ভালবাসে। এটাই আমাদের আসল ভাই! ভাইরে পাশ করাতে পারলে আমাদের একটা গতি হবে।' এসব ভাবার সময় এবং রাজপথে আমার ভাই, তোমার ভাই....স্লোগান দেয়ার সময় তারা কেউই জানত না নেতার এই মায়া পুরোটাই দেখানো। ভালবাসাতেও ছিল ভেজাল। সব আশ্বাস ছিল মিথ্যা। 

পাশ করার পরেই ধরা পড়ল নেতার অন্যরূপ। যেই নেতার জন্য তারা কাজ করেছেন নির্বাচনে পাশ করার পর সেই নেতাই থানায় একটি সন্ত্রাসীদের তালিকা দিলেন। যেই তালিকার সর্বপ্রথমেই ছিল, বড় ভাইটির নাম। তারপর একে একে গ্রুপের অন্যদের সবার নাম। নেতার কাছে কৈফত চাওয়ার সুযোগটাও পাওয়া গেল না। তার আগেই পুলিশ তাদের খুজতে শুরু করে। খবর পেয়ে যে যার মত আত্নগোপন করার চেষ্টা করে। নেতা নিজে থানায় লিস্ট দিয়েছেন এবং পুলিশের অর্ডার দিয়েছেন এদের যেভাবেই হোক ধরতেই হবে। আর তাই পুলিশের বিশেষ গুরুত্ব। ডাইরেক্ট একশন যাকে বলে আরকি। তাদের খুজতে প্রতিদিন এলাকায় পুলিশের গাড়ী। বাড়ীতে পুলিশের অভিযান শুরু হয়। অন্যত্র আত্নগোপন করেও একপর্যায়ে রক্ষা পাওয়া গেলনা। ধরা পরতেই হলো। এর মধ্যে একজন পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ড্রেনের পানি গিয়ে পরে এমন এক ডোবায় ঝাপ দিয়েও নাকি রক্ষা পাননি। পুলিশও তাকে ধরতে ডোবায় ঝাপ দিয়েছিল। 
যাকে নিয়ে গল্প তিনি ধরা পরার আগে তার এক বন্ধু ধরা পরেছিল। বন্ধুর দেয়া তথ্য সূত্রেই তিনিও ধরা পরেন। পরে সাজা হওয়াতে জেল খেটেছেন কয়েক বছর। 


আমার বাবা আমার মহানায়ক

-রফিকুল ইসলাম সাগর 
ছোট বেলা থেকেই বাবাকে খুব ভয় পাই। শুধু আমিই না আমাদের বংশের প্রায় সবাই আমার বাবাকে ভয় পায়। কখনো কিছু প্রয়োজন হলে ভয়েতে সরাসরি বাবার কাছে চাইতাম না। মাকে দিয়ে বলিয়ে আদায় করিয়ে নিতাম। যদিও সরাসরি বাবার কাছে কিছু চাইলে কোনদিন না করেননি। তারপরেও বাবার কাছে কিছু চাইতে গেলে অন্যরকম ভয় কাজ করতো। বাবার সাথে কাটানো যেই স্মৃতি আমার সবচাইতে বেশি মনে পড়ে সেটি হলো- বাবার ফুটবল খেলা খুব পছন্দ। তখন আমি অনেক ছোট। বাবা প্রায়ই স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে যেতেন। তখন মাঝে মাঝে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বাবার হাত ধরে স্টেডিয়ামে যেতাম এবং পাশাপাশি বসে ফুটবল খেলা দেখতাম। 

বাবার সবকিছুই আমার কাছে অন্যরকম লাগে। আশে-পাশের মানুষ গুলো ও আত্বীয় স্বজনদের আমার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা দেখে বাবাকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে সব মিলিয়ে বাবাই আমার নায়ক। 
চোদ্দ কি পনের বছর আগে বাবা তার সব বন্ধুদের সাথে কুরবানী ঈদের আগে গরু কিনতে ভুয়াপুর গিয়েছিলেন। সাথে আমিও ছিলাম। ঢাকা থেকে দুইটি প্রাইভেট কার এবং একটি মাইক্রোবাস নিয়ে আমরা সেখানে যাই। রাতে গরু কিনে নিয়ে ঢাকা ফিরছিলাম। সব গুলো গরু একটি ট্রাক ভাড়া করে তাতে উঠানো হয়েছিল ঢাকা নিয়ে আসার জন্যে। ফেরার পথে আমরা দুর্ঘটনা কবলিত একটি প্রাইভেট কার দেখতে পাই। বাবা আমাদের মাইক্রোবাস থামাতে চালককে নির্দেশ দেন। আমরা গাড়ি থেকে নেমে দুর্ঘটনা কবলিত প্রাইভেট কারটির সামনে গিয়ে দেখতে পাই, কারের ভেতর চালক মারাত্নক আহত অবস্থায় পরে আছে। ভেতরে আর কোনো যাত্রী ছিলনা। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই মুহুর্তে বাবার সব বন্ধুদের মধ্যে বাবা বলেছিলেন, একে ঢাকা নিয়ে যাই, হাসপাতালে ভর্তি করে দিব। পরে তাকে আমাদের মাইক্রোতে তুলে ঢাকা নিয়ে এসে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। লোকটিকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন ছিল সে সময়। তার রক্ত আমার বাবার রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে। তারপর বাবা রক্ত দিয়ে লোকটিকে বাঁচিয়েছিলেন। এই হলো আমার বাবা সব ক্ষেত্রেই পরউপকারী। মূলত এই কারণেই বাবা আমার দৃষ্টিতে নায়ক।  

আজ থেকে প্রায় তিন বছরের বেশি সময় আগে। তখন আমি মালয়েশিয়াতে থাকি। মালয়েশিয়াতে বছর বছর ভিসার মেয়াদ নবায়ন করতে হয়। আমার ভিসার মেয়াদ নবায়ন করতে পাসপোর্ট জমা দেয়ার মাত্র একদিন বাকি ছিল। এক বছর শেষ হতে বাকি ছিল মাত্র সাতদিন। সেদিন পর্যন্ত আমার হাতে পুরো টাকা ছিলনা ভিসা নবায়নের জন্য টাকা জমা দেয়ার। গোটারাত ঘুম হয়নি কিভাবে কাল ভিসার টাকা জমা দিব এ চিন্তায়। কোনো উপায় না পেয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা চাইব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু বাবাকে ফোন করে টাকা চাওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। আবার কিভাবে কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। সকালে সাহস করে বাবাকে ফোন করলাম। তার সাথে প্রথমে অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করি। এক পর্যায়ে তখনও আমি বাবাকে টাকার কথা বলিনি। কি অবাক করার মতো ব্যাপার বাবাই আমাকে বলে বসলেন, তোমার কি টাকা লাগবে? আমার মনে হচ্ছে তুমি সমস্যায় আছ। তোমাকে টাকা পাঠাই। আমি তো পুরো অবাক হয়ে গেলাম। চোখের কোনে পানি এসেছিল সে মূহুর্তে। বাবাকে শুধু বললাম, টাকা লাগবে। বাবা কোনো প্রশ্ন করলেন না টাকা কেন লাগবে। সাথে সাথে বললেন, টাকা কত পাঠাতে হবে? কিভাবে পাঠাব?

Wednesday, December 12, 2012

অনিয়মই যেখানে নিয়ম


-রফিকুল ইসলাম সাগর 

আমার বন্ধু মিজান বর্তমানে মালয়েশিয়া অবস্থান করছেন। তার আগে তিনি সৌদি আরব,দুবাই ও বাহরাইন প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। ১৪ বছরের প্রবাস অভিজ্ঞতা তার। বহুবার বাংলাদেশে যাওয়া-আশা করেছেন। বাংলাদেশ বিমানবন্দর ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি চরম ক্ষোভ তার। শুধু মিজান না মিজান ছাড়াও আরো অনেকের মুখে এই ক্ষোভের কথা শুনেছি। সেদিন মিজান তার প্রথম বিদেশ (দুবাই) যাওয়ার ঘটনা আমার সাথে শেয়ার করলেন।

ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা করা হয় তার। ফ্লাইটের চার-পাচ ঘন্টা আগে নোয়াখালী থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে এসে পৌছেন। আত্বীয়-স্বজন ছেড়ে অনেক দুরে চলে যাচ্ছেন জীবন যুদ্ধে জয় আনতে। মন ভাল নেই। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন মিজান। বিদায় জানাতে এসেছিলেন মা-বাবা,ভাই-বোন এবং সারাজীবনের সঙ্গী তার স্ত্রী। সবার চোখে জ্বল দেখে সবার সামনে না কাদলেও গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে না করতেই চোখে জ্বল চলে আসে তার।

মিজান বোডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার জন্য লাইনে দাড়ায়। একে একে সামনের জনদের পরে এলো তার সিরিয়াল। পাসপোর্ট তুলে দিলেন ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে, তার সঙ্গে দুবাই যে কোম্পানিতে কাজ করবেন সে কোম্পানির চুক্তি পত্র দিলেন। চুক্তি পত্র হাতে নিয়ে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পুলিশ বলল, এই চুক্তি পত্রে তো স্বাক্ষর করা হয়নি। আপনাকে দুবাই যেতে দেয়া হবে না। মিজান ভয় পেয়ে গেলেন। মিজান জানে বাংলাদেশ বিমানবন্দরে প্রতিদিনই এরকম ঘটনা ঘটে। যারা বিদেশ যায় যাওয়ার সময় তাদের সাহস দেয়ার পরিবর্তে,তাদের শুভ কামনা করার পরিবর্তে তাদের ভয় দেখায় বিমান বন্দর কর্মকর্তারা। ভোগান্তিতে ফেলে সময় নষ্ট করেন।
মিজান বললেন, স্যার এখন আমি কি করব? বিমান বন্দরের বাইরে আমার বিদেশ যাওয়ার এজেন্ট আছে, আমি একটু তার সঙ্গে কথা বলে আসি। কর্মকর্তার উত্তরে বলেন, না আপনি এখন আর বাইরে যেতে পারবেন না। আমাকে ৫০০ টাকা দিন আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। মিজান এবার মূল ঘটনা বুঝতে পারলেন।

মিজান বললেন, আমি যাব দুবাই, আমার কোম্পানি দুবাইযে, আপনাকে ৫০০ টাকা দিলে স্বাক্ষর কে করবে? আপনি ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করুন, আপনার সঙ্গে পড়ে কথা বলছি- ইমিগ্রেশন অফিসারের এমন উত্তরের পাল্টা জবাব দিলেন মিজান, আমি ওখানে অপেক্ষা করব কেন? আপনি আগে আমার ঝামেলা শেষ করুন। এভাবে তর্ক-বিতর্ক হওয়ার এক পর্যায়ে এক জন সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা দূর থেকে এগিয়ে এলেন। কী হয়েছে? মিজান তার কাছে বললেন, আমার চুক্তি পত্রে নাকি সাইন হয়নি তার জন্য ইমিগ্রেশন অফিসার আমার কাছে ৫০০ টাকা চান।  সেনাবাহিনীর ওই কর্মকর্তা  বললেন, তাকে হয়রানি না করে যেতে দিন।

পাচ বছর পর যখন মিজান বাংলাদেশে ফিরে এলেন। ইমিগ্রেশন থেকে বের হয়ে আসার সময় তার ব্যাগ স্ক্যান মেশিনের ভিতর দেয়া হলো। একজন পুলিশ বললেন, আপনার ব্যাগ খুলুন। মিজান বললেন কেন? আপনার ব্যাগে কী আছে দেখব। আমার ব্যাগে কী আছে স্ক্যানে কী দেখেননি? আমি ব্যাগ খুললে আপনি পরে ব্যাগ গুছিয়ে দিবেন? পুলিশ বলল, বিদেশ থেকে অত টাকা আয় করলেন আমাদের চা-নাস্তার জন্য কিছু দিন। মিজান বললেন, আমি যখন বিদেশ গিয়েছিলাম তখন আপনারা আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন যে আমি আপনাদের চা-নাস্তা করার জন্য টাকা দেব? উত্তরে পুলিশ আর কোনো জবাব দিল না। পিছন থেকে অনেক বাঙালি বলাবলি করছিল দেশের সব মানুষ যদি এমন হত তাহলে কেউ আমাদের হয়রানি করার সাহস করত না।

মিজানের সাথে যেই ঘটনা গুলো ঘটেছে বাংলাদেশ বিমানবন্দরে প্রতিদিন কারো না কারো সাথে এই ঘটনা ঘটছে। দেখার যেন কেউ নেই। যারা নতুন তাদের হয়রানি ভয়-ভীতি দেখানো হয় বেশি। বিমান বন্দরের কর্মীরা অনিয়মকেই করে নিয়ম। 

১১ ডিসেম্বর ২০১২ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত।