Wednesday, April 22, 2015

নৌ পথে একটি দুর্ঘটনার গল্প

রফিকুল ইসলাম সাগর

চারিদিকে ঠান্ডা বাতাস। দুপুর  বেলায় চারিদিকে অন্ধকার  হয়ে এসেছে। আকাশে প্রচন্ড মেঘ জমেছে। ঝড় হবে প্রচন্ড ঝড়। সমুদ্রে  ঢেউ বেড়েছে। সমুদ্রে/নদীতে চলাচল কারী জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার জন্য রেডিওতে ঘোষণা প্রচারিত হলো। ৯ নাম্বার বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছে। একবার এদিক আরেকবার ওদিক জাহাজের দুলাদুলিতে তুহিনের ঘুম ভেঙে গেলো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে বাইরে ঝড় হচ্ছে, সাথে শিলা বৃষ্টি এবং অনেক বেশি ঢেউ। ভয় পেয়ে যায় সে। দৌড়ে ছাদের উপর উঠলো অন্য সব সহকর্মীদের খোঁজার জন্য। ছাদের উপর গিয়ে তিন সহকর্মীকে পেয়ে যায়। তাদের দেখে ভয় কিছুটা কাটল। জাহাজ ভর্তি সিমেন্ট। থাইল্যান্ড এর সীমানা অতিক্রম করে তারা মায়ানমার পৌঁছেছে। জাহাজ পাইলট কোনো এক পাড়ে জাহাজ ভিড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ততক্ষণে জাহাজের নিচের এক অংশ পাথরের সাথে আঘাত লেগে ফাটল ধরে যায়। পানি প্রবেশ করা শুরু হয়ে  যায় ভিতরে। নিরাপদ স্থানে জাহাজ নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এক তলা অতিক্রম করে দোতলায়  পানি প্রবেশ করতে শুরু হয়েছে। সিমেন্টের বস্তাগুলোতে পানি 

ঢুকে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। জাহাজটি পুরো পুরি ডুবে যাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে পাইলট লাইফ জ্যাকেট ও টায়ার নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্রে। ওদিকে তুহিন, মোবারক ও রহিম লাইফ জ্যাকেট-টায়ার কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। যেই কক্ষে লাইফ জ্যাকেট ও টায়ার থাকার কথা সেই কক্ষ পুরোপুরি পানির নিচে। তিন জন ধরে নিয়েছে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু। সাহসিকতা দেখিয়ে তুহিন পানিতে ডুব দেয়।  কয়েবার ডুব দিয়ে  পেয়ে যায় একটি টায়ার ও লাইফ জ্যাকেট। এখন আর  দেরী করা ঠিক হবে না। তুহিন লাইফ জ্যাকেটটি শরীরের সাথে জড়িয়ে নেয় এবং টায়ারের মাঝখানে বসে পড়ল। মোবারক ও রহিমকে টায়ারের সাথে দড়ি দিয়ে বেধে নিল যেন পানির স্রোতে কেউ হারিয়ে  না যায়। বাঁচার শেষ চেষ্টা তাদের। জাহাজ পুরোপুরি ডুবে গিয়েছে। পানির  স্রোত তাদের তিন জনকে ভাসিয়ে নিয়ে  যাচ্ছে। গন্তব্য কোথায়   কেউ জানে না।
তিনজনের চোখে মৃত্যুর ভয়। এক জন আরেক জনকে সাহস দিচ্ছে। রহিম গান ধরল। রোমান্টিক গান। তুহিন ধমক দিয়ে  বললো ওই শালা আমরা মরতেছি আর তুই  রোমান্টিক গান শুনাছ। আইচ্ছা কী আর করার  রোমান্টিক গানই গা। জীবনে তো বহুত বিরহের গান শুনলাম মরার আগে একটা রোমান্টিক গান শুনে মরি। মোবারক পাগলের মতো হাসতে শুরু করল। তুহিন বললো কিরে কী হইছে হাসিস কেন?
মোবারক: হাসতাছি একটা কথা মনে পইরা গেলো।
তুহিন: কী কথা?
মোবারক- গত ছুঁটিতে বাড়ি গিয়ে ছিলাম। আমার রুমে  শুয়ে একটা গান ধরছিলাম। জোসনা কথা বলোনা…। পাশের রুম থেকে  জোসনা ভাবি বলে বসলো কিগো  দেওর আমি আবার কখন কথা বললাম?
হা ! হা ! হা ! মোবারকের কথা শুনে তিনজনই হাসতে শুরু করল। পানির  স্রোত বেড়েই চলছে। বৃষ্টিও থামছে না। শীতে তিনজনের করুণ অবস্থা। চিৎকার করে কান্না শুরু হলো। বিধাতার কাছে বাঁচার আর্তনাত। আশে পাশে কেউ  নেই। দূর দুরান্তে আলো দেখা যায় না। স্রোতে তাদের  কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তারা কেউ জানে না। বিকেল পেরিয়ে রাত হয়েছে। কারো কাছে ঘড়ি নেই। আন্দাজ করে বুঝা যাচ্ছে পাঁচ-ছয় ঘন্টা অতিক্রম হয়েছে।
রহিমের পা জেলেদের মাছ ধরার জালে আটকা পড়েছে। জাল থেকে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করে পা আরও বেশি জালে পেচিয়ে যায় । টায়ার সামনের দিকে এগোচ্ছে না। এখন কী হবে? বাঁচার আর  কোনো উপায়  নেই। রহিম বললো তুহিন ভাই আমার শরীর থেকে দড়ির বান খুলে দেন।
তুহিন : তাহলে তো তুই মারা যাবি?
রহিম : কী আর করমু? আমার মৃত্যু নিশ্চিত। আমার জন্য আপনারা মরবেন। আমারে ছাইরা দেন। যদি বাইচ্যা থাকেন তাইলে আমার জন্য  দোয়া কইরেন। আর আমার বাপ-মা আত্বীয় স্বজন সবাইরে বইলেন আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি তারা যেন আমারে ক্ষমা কইরা দেয় । আপনারাও আমারে ক্ষমা করে দিয়েন। রহিম শরীর থেকে দড়ির বাধ খুলে  দেয়া হলো। তুহিন ও মোবারকের সামনে তার চিৎকার। দুইজন দেখছে রহিমের মৃত্যু কিন্তু কিছুই করার নেই। পানির স্রোত তাদের দুইজনকে অনেক দুরে ভাসিয়ে  নিয়ে  গিয়েছে। অদৃশ্য হয়ে গেলো রহিম। তিনজন এক সাথে ছিল এখন হয়েছে দু’জন। দু’জনের মৃত্যুর ভয়  আরও বেড়ে গেলো। দু’জন দু’জনের কাছে ক্ষমা  চেয়ে  নিল। সৃষ্টিকর্তার নাম বার বার বলা শুরু হলো। ভয়ে  দু’জনের মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। পাড় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাড় কোথায় আছে বুঝার কোনো উপায় নেই। দূর থেকে একটি লঞ্চ আসতে দেখা যাচ্ছে। তারাই পারে এখন সাহয্য করতে। বাঁচার চেষ্টায় , চিৎকার করছে ওরা দু’জন। বাঁচাও! বাঁচাও! বাঁচাও…..।
লঞ্চের  কেউ তাদের দু’জনের ডাক শুনতে পেলনা। নাকি শুনতে পেয়েও সাহায্য করতে এলোনা। পাশ দিয়ে চলে  গেলো। প্রায় ভোর হয়েছে। এখন আর বৃষ্টি হচ্ছে না। পানির স্রোত কমে গেছে। তুহিন নিশ্চিত আর একটু  গেলেই হয়তো পাড়ে ভিড়বে ওরা। পা দিয়ে পানির নিচে মাটি খুঁজছে। মোবারককে বললো আর একটু…।  মোবারক উত্তরে কিছু বলছে না। এই মোবারক ?  মোবারক?
মোবারক কিছু বলছে না। শরীরে হাত দিয়ে দেখে  মোবারকের শরীর ঠান্ডা শক্ত হয়ে গেছে। বুঝতে পারল প্রচন্ড শীতে মোবারক মারা গেছে। মোবারকের শরীর  থেকে টায়ারে বাধা দড়ির বান খুলে দিলো তুহিন।
পানির সাথে বেচে থাকার যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে  টায়া
রের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তুহিন। পানিতে ভাসতে ভাসতে পাড়ে   গিয়ে ভিড়ে টায়ার। নৌ-বাহিনারা তুহিনকে অজ্ঞান অবস্থায  উদ্ধার করে। ঘুম ভেঙে দেখে সে নৌ-বাহিনীর হাসপাতালে।
(একটি নৌ-দুর্ঘটনা থেকে বেচে আসা তুহিনের মুখে  শোনা বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা লিখলাম)

No comments:

Post a Comment