Wednesday, April 22, 2015

স্বপ্ন অপূর্ণ নেই


-রফিকুল ইসলাম সাগর 
একটা সময় রিক্সা, অটো রিক্সা, কার, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক, নৌকা, ট্রলার, স্টিমার, লঞ্চ ও ট্রেন এই সব যানবাহনে ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলাম আমি। স্বপ্ন দেখতাম উড়োজাহাজে চড়ার। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য যখন জীবনে প্রথম উড়োজাহাজে চড়লাম তখন আমার ধারণা হলো সব চেয়ে বোরিং জার্নি উড়োজাহাজে জার্নি। উড়োজাহাজে ভ্রমনে আমি কোনো আনন্দ পাইনি। সময় কেটেছে খুব বোরিং ভাবে। এর মাঝে কোনো বিনোদন নেই। ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টার পথ এতেই এই অবস্থা তাহলে যারা ঢাকা থেকে ইউরোপ যায় তাদের অবস্থা বুঝার বাকি নেই। যারা উড়োজাহাজে ভ্রমন করেছে সবাই বলবে এর চেয়ে বোরিং জার্নি আর কিছুতে নেই। তারপর বহুবার উড়োজাহাজে ভ্রমন করেছি। বলা যায় বাধ্য হয়েই করেছি।
বাকি ছিল হেলিকাপ্টারে ভ্রমন। হেলিকাপ্টার ভ্রমন নিয়ে মনের গভীরে লুকিয়ে ছিল চরম আগ্রহ। মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপে মোটর সাইকেলে করে ঘুরতে ঘুরতে একটি মাঠে ছোট একটি হেলিকাপ্টার দেখতে পেয়ে এগিয়ে যাই। সাথে আমার আরো দুইজন বন্ধু ছিল। সেই মুহুর্তে আসে পাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। হেলিকাপ্টারটির কাছাকাছি গিয়ে ক'টি ছবি তুলতেই একজন মালাই মহিলা এগিয়ে এসে আমাদের নিষেধ করলেন ছবি তুলতে। আমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, হেলিকাপ্টার ভ্রমণের জন্য খরচ কত পরবে? মাঠের পাশের একটি রুমে ডেকে নিয়ে আমাদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এতে সব লেখা আছে। কাগজে লেখা সব চেয়ে কম টাকার প্যাকেজ আমাদের অবাক করলো। তিনজন চড়তে পারবে। খরচ ৪০০ রিঙ্গিত। বাংলাদেশী টাকায় ১০ হাজার টাকার মত। এই সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবেনা। একটু মুলামুলি করে ৩৫০ রিঙ্গিতে রাজি করলাম। বললাম, এখনই চড়ব। মহিলাটি বলল, তোমরা একটু অপেক্ষা কর আমি পাইলটকে ফোন করে জেনে নেই সে এখন আসতে পারবে কিনা। আমাদের ভাগ্য ভালো যে পাইলটের হাতে কোনো কাজ ছিল না। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে আসছেন বলে জানালেন। পাচ মিনিটের মধ্যে একটি ক়ালো রঙের গাড়িতে চড়ে এসে একজন নামলো। তার পড়নে শর্ট প্যান্ট এবং সাদা টি শার্ট। ইনি-ই হলেন পাইলট। তার সাথে ছিলেন আরো একজন। কানে বড় হেডফোন আর লাইফ জ্যাকেট পড়ে আমরা হেলিকাপ্টারে উঠে বসলাম। আমাদের বলা হলো কোনো রকমের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পাইলট ইঞ্জিন স্টার্ট করলেন। পাখা গুলো ঘুরতে শুরু করলো। প্রায় তিন মিনিট এভাবে স্থির থাকার পর একজন বাইরে থেকে পাইলটকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন ১,২,৩,৪ এবং ৫ তারপর হেলিকাপ্টার একটু একটু করে উপরে উড়ল। নিচে যিনি ছিলেন তার কানেও হেডফোন ছিল। তার সাথে পাইলটের সর্বক্ষণ কথা হচ্ছিল। হেডফোনের মাধ্যমে আমরাও শুনতে পাচ্ছিলাম সেই কথা। হেলিকাপ্টার উড়িয়ে আমাদের নিয়ে গেল সমুদ্রের মাঝামাঝি। তখন একটু ভয় লাগছিল বিশাল নীল্ সমুদ্র। রোমাঞ্চকর অ্যাডভ্যানচার ভ্রমন। প্রচন্ড বাতাস শরীরে অনুভব করছিলাম। দেখতে পেলাম সমুদ্রের বুকে ছোট বড় ক'টি আইল্যান্ড। কাছ থেকে আইল্যান্ডের পুরোটা সৌন্দর্য দেখতে পেলাম। চোখে ধরে রাখার মতো দৃশ্য। উপর থেকে আইল্যান্ডের গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে নিচ পর্যন্ত দেখা যায়। বন্য প্রাণীর মধ্যে শুধু বানর আর নানান ধরনের পাখি দেখতে পেলাম। হেলিকাপ্টারের আগমনে বানর গুলো এ ডাল থেকে ওডালে করে নিচের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য উপভোগ্য। পাখি গুলো সব উড়ে পালাচ্ছিল।

আট মিনিট উড়ারপর হেলিকাপ্টার আবার সেই আবার জায়গায় অবতরণ করলো। এই ভ্রমণের পর আমার মনে হয়েছে সব চেয়ে মজার ভ্রমন হেলিকাপ্টার ভ্রমন। সেই মুহুর্তে আমার আরো মনে হয়েছিল আমার জীবনের আর কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ নেই

দৈনিক বর্তমানে প্রকাশিত (১৩ নভেম্বর ২০১৩)

No comments:

Post a Comment