রফিকুল ইসলাম সাগর
লেখালেখি করে জীবন চলে না, এই কথা মেনে নিয়েই লেখালেখিতে হাত বাড়িয়েছিলাম। এ পর্যন্ত বন্ধু-বান্ধব, আত্বীয়-স্বজন ছাড়াও নানান জনে নানান রকম কথা বলেছে। কে কী বলল না বলল আমার কিছু যায় আসে না। 'এগিলা কইরা কোনো লাভ নাই, কি হয় লেইখা!,'' এমন কথা শুনে কখনো কখনো হতাশ হয়েছি, ভয় পেয়েছি। কিন্তু এই লেখালেখির কারণে যখন কোনো ভক্তের চিঠি আমার ঠিকানায় এসেছে, চিঠি পড়ে অনেক খুশি হয়েছি। আবার যখন কোনো ভক্তের ফোনে আমার মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠেছে, কথা বলে সাহস পেয়েছি। নতুন করে আশা জেগেছে। এ পর্যন্ত বড় বড় যতো লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছি সবার উপদেশের তালিকায় একটা উপদেশ ছিলই, 'বেশি বেশি বই পড়তে হবে'। ভালো লিখতে হলে বেশি বেশি বই পড়তে হবে, একথা মানতেই হবে। ভালো লিখতে হলে বইপড়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি লেখা যে বিষয়ে হবে সে বিষয়ে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বইয়ের ক্ষেত্রে আমি খুব যত্নবান। আমার সংগ্রহে থাকা দশ বছর পুরনো বই গুলো যে কেউ দেখলে বলবে নতুন কেনা। যখন স্কুলে পড়তাম তখনো বছর শেষে অন্য সহপাঠীদের বই পুরান হয়ে গেলেও আমারটা থাকতো নতুনের মতো। কেউ যখন পড়ার জন্য আমার কাছে বই ধার চায় দিতে মায়া লাগে। বই দিলে কারো কারো কাছ থেকে আর ফেরত পাওয়া যায় না, কেউ কেউ হারিয়ে ফেলে নয়তো দেখা যায় আমার অনুমতি ছাড়া তার কাছ থেকে আরেকজন নিয়ে গেছে। কেউ ফেরত দিলেও বই হাতে পেয়ে দেখা যায় অযত্ন অবহেলায় ছিড়ে গেছে। কাউকে বই দেয়ার পর যদি কোনদিন তার বাড়ীতে গিয়ে দেখি বইটি নোংরা জায়গায় রাখা, বইয়ের উপর ধুলো পড়ে আছে তখন যেন আমার ভিতরে পুড়ে। যখন এমন কাউকে পেয়েছি যার ভিতরে বই পড়ার চরম আগ্রহ, যার ভিতরে বই পড়ার মারাত্নক নেশা অনুভব করেছি তার হাতে আমার সংগ্রহে থাকা অসংখ্য বই তুলে দিয়েছি। তাদের হাতে নিজের জমানো বই তুলে দিতে একটুও খারাপ লাগেনি বরং অসীম আনন্দ অনুভব করেছি।
'লেখক' এই পরিচয় যে কোনো পরিচয় না এটা কিছু কিছু মানুষ সব সময় মনে করিয়ে দেয়। আমার মনে হয় যারা এমন করে তারা একজন লেখককে হতাশ করার জন্য এবং হিংসায় এই কাজ করে কিন্তু সেটা বুঝতে দেয় না। এই মানুষ গুলোর কথায় যখন নিজেকে পরাজিত মনে হয় তখন, ক'জন মানুষের অনুপ্রেরনায় আমি আবার স্বপ্ন দেখি। তারা যখন বলেন, 'লিখতে থাকো একদিন ফলাফল পাবে।' তখন স্প্রিড আরো বেড়ে যায়। গত বই মেলায় একজন লেখকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তার দুইটি বই প্রকাশ হয়েহে। কিছুদিন আগে সেই লেখক আমাকে ফোন করলেন, আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি দেখা করলাম। নানান বিষয়ে কথার ফাঁকে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, আইচ্ছা ভাই আপনি যে পত্রিকায় লেখেন এর জন্য কত টাকা দিতে হয়? তার প্রশ্নে আমি অবাক হলাম! তাকে বললাম, ভাই আপনি কোনদিন পত্রিকায় লেখেন নি? বলল, না! তারপর পত্রিকায় লেখা কিভাবে দিতে হয় জানতে চাইল। তার এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার তো দুইটা বই প্রকাশ হইছে বই গুলো কী টাকা দিয়ে প্রকাশ করেছেন? বলল, হুম। এরপরে তার বই প্রসঙ্গে আর কথা বললাম না। তাকে পত্রিকায় কিভাবে লেখা পাঠাতে হয় বুঝিয়ে দিলাম। এটাও বললাম, 'পত্রিকায় লেখা মানসম্মত হলেই ছাপে, টাকা দেয়া লাগে না, শুধু তাই নয় লেখার জন্য অনেক লেখকদের সম্মানীও দেয়া হয়।' আমার মতে একজন প্রকিত লেখক সম্মানী পাওয়ার আশায় লেখেনা। লেখালেখি এক প্রকার নেশা। লেখা প্রকাশ হওয়ার যে আনন্দ তা কোটি টাকা খরচ করেও পাওয়া যাবে না। তবে জীবন সংসারের প্রয়োজনে সম্মানী প্রয়োজন। এবং সম্মানী লেখকের উত্সাহ বাড়ায়। লেখালেখিতে হাত বাড়ানোর পর ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি।লেখালেখি করে সম্মানী খুব কম লেখক পায়। এ সম্মানী পেতে একজন লেখককে কতো কষ্ট করতে হয়, কতো সময় অপেক্ষা করতে হয় তা শুধু লেখকই জানে। অনেকে সম্মানী দেয়ার কথা দিয়ে কথা রাখেনি। দেশে নিজের টাকা খরচ করে বই প্রকাশ করা লেখকেরঅভাব নেই। এমন বই প্রকাশ করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। টাকা দিয়ে তো সবাই বই প্রকাশ করতে পারে। যারা রাতারাতি লেখক হতে চায়, তারা রাতের আধারেই আবার হারিয়ে যায়। এ সময়ের অনেক লেখক লেখার আগেই হিসেব করে সম্মানী কত দেয়া হবে। মানসম্মত লেখা না লিখলে যে ছাপাই হবে না সেই হিসেবের আগেই সম্মানীর হিসেব করা ঠিক না।লেখালেখি এমন একটা পেশা যার ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয়। ধৈর্য ধারণ করে লেখা চালিয়ে গেলে ভালো ফলাফল আসবে বলে বিশ্বাস করি।

No comments:
Post a Comment